ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন
হযরত খাজা শায়খ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জে শকর (রঃ আঃ)
হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন কাকী (রহঃ) এর
সংক্ষিপ্ত জীবনি
হযরত কুতুবুল আকতাব সায়্যেদেনা খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী আউশী কুদ্দেসা সিররুহুল আজিজ হযরত হুসাইন রাদি আল্লাহতায়লা আনহু এর বংশধর । তার বংশ তালিকা নিম্নরুপ।
(১) তার পিতার নাম সৈয়দ কামাল উদ্দীন (রহঃ)
(২) তার পিতার নাম সৈয়দ মুহম্মদ (রহং)
(৩) তার পিতার নাম সৈয়দ ইসহাক (রহঃ)
(৪) তার পিতার নাম সৈয়দ মারুফ (রহঃ)
(৫) তার পিতার নাম সৈয়দ আহ্ মদ (রহঃ)
(৬) তার পিতার নাম সৈয়দ রেজাউদ্দীন (রহঃ)
(৭) তার পিতার নাম সৈয়দ হিসাম উদ্দীন (রহঃ)
(৮) তার পিতার নাম সৈয়দ রশিদ উদ্দীন (রহঃ)
(৯) তার পিতার নাম ইমাম সৈয়দ মুহম্মদ যুয়াদ (রহঃ)
(১০) তার পিতার নাম ইমাম সৈয়দ আলী মূসা (রহঃ)
(১১) তার পিতার নাম ইমাম সৈয়দ মূসা কাজেম (রহঃ)
(১২) তার পিতার নাম ইমাম সৈয়দ জাফর সাদিক (রহ)
(১৩) তার পিতার নাম ইমাম সৈয়দ মুহম্মদ বাকের (রহ)
(১৪) তার পিতার নাম ইমাম সৈয়দ জয়নুল আবেদিন (রাদি)
(১৫) তার পিতার নাম ইমাম সৈয়দ হুসাইন (আঃ)
(১৬) তার পিতা আমিরুল মু,মেনীন হযরত আলী (রহঃ)
হযরত খাজা কুতুবউদ্দীন (রহ) ওরাউল মহ্ যর - এর অন্তর্গত আউশ নামক এক প্রখ্যাত গ্রামে জম্মগ্রহণ করেন। তিনি আউলিয়াদের মাঝে জম্মগত ওলী হিসেবে পরিচিত । হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) মতো তিনিও মায়ের উদর হতে ১৫ পারা পাক কালাম (কোরান শরীফ ) মূখস্থ করে ভূমিষ্ঠ হন । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলামের মাতা ও গাওস পাকের মাতার ন্যায় ১৫ পারা কোরান শরীফ মূখস্থ পড়তে পারতেন, অবশ্য গাওস পাকের আম্মা ১৮ পারার হাফেজ ছিলেন । হযরত খাজা কুতুবের আম্মা তাকে গর্ভে ধারণ করার পর নিয়মিত ঐ মূখস্থকৃত কোরান শরীফ তলোয়াত (পাঠ) করতেন। এবং হযরত খাজা তার আম্মার জবান মোবা রক হতে শোনে শোনে তা মূখস্থ করেছিলেন। ( সোবাহানাল্লাহ্ ) শুক্রবার মধ্যরাত্রির পর তিনি ভূমিষ্ঠ হন। ভূমিষ্ঠের পূর্বে তার আম্মা ঘুমিয়ে ছিলেন, হঠাৎ ঘড় আলোকিত হয়ে যাওয়ায় তার নিদ্রা ভঙ্গ হয়। এ অলৌকিক দৃশ্যঅবলোকনে তার আম্মা আশ্চর্য ও ভীত হয়ে পরলেন। এ ঐশ্বী নূরের উৎস কোথায় তিনি তা জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে আল্লাহতালার দরবারে হাত তুললেন, " হে বারে এলাহী এ নুরের কারণ সমন্ধে আমায় অবহিত করালে তৃপ্তি পেতাম। সাথে সাথে গায়েবী আওয়াজ হলো, এ নূর কুতুবউদ্দীনের , যে তোমার গর্ভে অবস্থান করছে। এর কিছুক্ষণ পরেই খাজা কুতুবউদ্দীন ভূমিষ্ঠ হলেন, এবং ঘরের সমস্ত নূর তার হৃদয়ে প্রবেশ করল। এবং ভূমিষ্ঠ হয়েই তিনি সেজদাবনত হয়ে ছিলেন। এ ঘটনার পর হতেই তিনি কুতুবউদ্দিন ( দ্বীনের ধ্রবতারা ) নামে পরিচিত। অর্থাৎ জম্মগত ভাবেই তিনি "ওলী" বা আল্লাহর বন্ধু ছিলেন এবং এ জন্যই তাঁকে মাদারজাত ওলী বলা হয় ।হযরত খাজা কুতুবের মাননীয়া আম্মা বললেন, বুজুর্গীর প্রভাব জম্মলগ্ন হতেই তার মাঝে শুরু হয়েছে। ভূমিষ্ঠ কালীন অলৌকিক ঘটনাসমূহই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ ছাড়াও রয়েছে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা । যেমনঃ আমি যখন রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে উঠতাম, তখন শিশু কতুবও জাগ্রত হতো এবং এক ঘন্টা বা তারও বেশী সময় আল্লাহু আল্লাহু জিকির করতো; যার আওয়াজ আমার কানে স্পষ্ট ভেসে আসতো। যখন তার বয়স ৩০ মাস তখন পিতার ছায়া তার মাথা হতে বিদায় নিলো। স্বভাবতই লালন পালনের ভার তার মায়ের উপর ন্যাস্ত হলো। যখন তার বয়স ৪ বছর ৪ মাস ৪ দিনে পর্দাপন করলো তখন খাজা খিজির ( আঃ) দর্শন দিয়ে তার মায়ের নিকট হতে তাকে নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার জন্য হযরত আবা হফস এর নিকট সমর্পন করলেন, যিনি ঐ সময় যামানার কুতুব ছিলেন। হযরত খাজা খিজির (আঃ) বললেন, মাওলানা এ থেকে আমাকে অনেক কাজ করিয়ে নিতে হবে, আপনি একে পবিত্র শিক্ষা দান করুন। একটা বিশেষ সময় পর্যন্ত তিনি মাওলানা খাজা হবস্ এর নিকট এবং পরে মাননীয় কাজী হামিদুদ্দীন নাগোরীর নিকট পড়াশুনা করেন। এরপর তিনি আল্লাহর পথের
জ্ঞানার্জনের জন্য প্রকৃত মানুষের সন্ধানে বের হলেন । ৬১২ হিজরীর ৫ই রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার বাগদাদ শরীফে ইমাম আবু লায়সা সমরকন্দী রহঃ মসজিদে হযরত খাজা গরীব
উন নওয়াজের হাতে বয়াত গ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করলেন, বর্ণিত আছে যে, তিনি বহু দিন পর্যন্ত খাজা গরীব উন নওয়াজের সাথে থেকে রিয়াজাত ( উপাসনা) কঠিন মোজাহেদার মধ্যে নিজেকে নিমগ্ন করে দুনিয়াদারীর সমস্ত কিছু হতে বিমুক্ত ছিলেন। এবং খাজা গরীব উন নওয়াজের সোহবতের (সঙ্গলাভের) আর্শীবাদ লাভ করেন। যখন হযরত খাজা বুজুর্গ (রহঃ) নবী করিম (সাঃ) এর নির্দেশে বাগদাদ শরীফ আজমির শরীফ অভিমূখে রওনা হলেন তখন খাজা কুতুব (রহঃ) স্বীয় মূর্শেদের প্রেমের আর্কষণে সঙ্গী হয়ে দিল্লী পৌছলেন। খাজা বুজুর্গ গরীব নওয়াজ কিছু দিন দিল্লী অবস্থানের পর যখন আজমীর অভিমূখে রওয়ানা হন তখন খাজা কুতুবকে দিল্লীতে রেখে গেলেন। কিন্তু খাজা কুতুব প্রজ্বলিত প্রেমাকর্ষণে তার সাথে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। খাজা গরীব নওয়াজ বললেন, রূহানী উন্নতির পরে কিছুদিন বিচ্ছিন্ন থাকার প্রয়োজন আছে। তাছাড়াও তোমার স্থান এ দিল্লীতেই নির্ধারিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুর্শেদের ইচ্ছায় তিনি দিল্লীতেই অবস্থান করলেন। কিন্তু গোলামী লাভের জন্য বেশ কয়েকবার আজমির শরীফ গমন করে ছিলেন। হযরত খাজা বুজুর্গ ও ভক্তের প্রেমের আর্কষণে দুবার দিল্লী এসে ছিলেন। হযরত খাজা কুতুব মুর্শেদের বেশাল শরীফের (স্রষ্টার মিলনের মাধ্যমে দেহত্যাগ) সময় দিল্লীতে ছিলেন। ২০ দিন পূর্বে তরীকার শাসন ক্ষমতা (সাজ্জাদা নওশীন খলিফা) লাভ করে রসূলে মকবুল (সাঃ) এর অভিজ্ঞান ও আমানত পীরের মাধ্যমে লাভ করে তা সাথে নিয়ে পীর ও মুর্শেদের নির্দেশানুযায়ী আজমির শরীফ হতে দিল্লীতে ফিরে আসেন। খিলাফত প্রদান করে হযরত খাজা বুজুর্গ হযরত খাজা কুতুবকে বললেন, হে কুতুব, তুমি বড় পবিত্র ও সৌভাগ্যবান'' অবশ্য কথাটা এ জন্য বলছি যে, আজ ৪০ দিন হতে ক্রমান্বয়ে রসূল (সাঃ) স্বপ্নে আমাকে এরশাদ করতেন যে, কুতুবউদ্দীন আমার এবং আল্লাহতালার উভয়েরই বন্ধু। তাকে তোমার খিলাফত দান কর এবং আমার খিরক্কা যা তোমার কাছে তাকে পরাও। অদ্য রাতে আমি আল্লাহ তালাকে স্বপ্নে দেখলাম, তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন, কুতুবউদ্দীন আমার বন্ধু যে নিয়ামত তোমার কাছে রয়েছে তাকে তা দান করে তোমার পরবর্তী খলিফা মনোনীত করো। হযরত খাজা কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহঃ) এর বিভিন্ন অবস্থা, কাশ্ ফ ও কারামতের অজস্র ঘটনা তার জীবনিতে বর্ণিত রয়েছে । এ ক্ষুদ্র পুস্তকে সে সাগরের বর্ণনার অবকাশ কোথায় ? তার সামান্য বর্ণনা করলেও একটা পূর্ণ কিতাবের প্রয়োজন। হযরতের বেছাল শরীফ সামার হালতে(সংগীতের প্রতিক্রিয়ায়) ঘটেছিল, যার জন্য তাকে শহীদুল মহব্বত বলা । হয়। এ ঘটনাটি "কুতুবে ছ' র
কিতাবে এভাবে বর্ণিত আছে যে, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে খানকায়ে আলিয়ায় হরযত রসূলে মকবুল (সাঃ) এর প্রেমের শানে (মর্যাদায়) সামা (বিশুদ্ধ গান ) হচ্ছিলো হাজার হাজার শ্রেষ্ঠ সুফী ও আরিফগন ঐ সামার মজলিসে সামা শ্রবণ
করতে করতে বেহুশ হয়ে পরেছিলেন। কাউয়ালগণ গাইতে ছিলেন ঃ-
আশেকের রুইয়াত কেজো বিনাদ বকস
বস্তায়ে মুইয়ত নামি ইয়াবদ খালাস ।
অর্থ -- প্রেমিক তোমাকে ছাড়া কিছুই দেখে না
তোমার দর্শনেই মুক্তি পায় ॥
প্রেমিকের দৃষ্টি কোথায় দেখেছে কাকে
তোমার মৃত্যু ফাঁদের বন্দিত্ব হতে
মুক্তি পেয়েছে কে কবে । মুক্তি পায়নি কেউ
এই পংতি দুটো গীত হওয়ার পর খাজা কুতুবের ক্রন্দন শুরু হলো এবং প্রেমোন্মত্তা এতো বাড়লো যে , আয়ত্বের সীমা অতিক্রম করে চলে গেলো। অবস্থা সঙ্গীন পরিদৃষ্ট হওয়ায় কাউয়ালগন ঐ গান ছেড়ে এ গজল (গান) গাওয়া শুরু করলো।
মঞ্জীলে ইশ্ কাত মাকানে দিগারাস্ত,
মরদে' ইয়ে রাহ রানে নিশানে দিগারাস্ত
কুশতাগানে খঞ্জরে তসলিমে রা "
হর জামাঁনে আয গায়বে জানে দিগারাস্ত ।
অর্থঃ- তোমার প্রেমের মঞ্জিলের স্থানটিই ভিন্ন
এ পথের বীরদের চলার নমুনাই ভিন্ন
প্রেমে বধিতজন জানায় তসলিম (অভিবাদন) খঞ্জরকে (ধারালো অস্ত্র)
প্রতি মূহুর্তেই অদৃশ্যলোক হতে পায় স্বাদ ভিন্ন জীবনের নবজীবন লাভ করে ॥
এ গজল গীত হওয়ায় হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এর ওজদ (আত্মীক উম্মাদনা) পূর্বের অবস্থাকে অতিক্রম করে চলেগেলো। বাহ্যিক অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, মাছকে পানি হতে তুললে যে রূপ হয় , ঠিক তদ্রুপ । ৩ দিন ৩ রাত পর্যন্ত এ অবস্থার মধ্যে বিরাজমান ছিলেন । নামাজের সময় হলে জ্ঞান ফিরে পেতেন এবং নামাজ শেষে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতেন। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে ৬৫৩ হিজরীর ১৪ ই রবিউল আউয়াল দিল্লীতে মহামহিমার সাথে মহামিলন (বেছাল মোবারক) ঘটলো। অর্থাৎ ইহলোক ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহ পাকের জাতের নৈকট্য লাভ করেন।
তিনি কত বছর হায়াত (আয়ু) পেয়ছিলেন তাঁর সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না বললেই চলে । হযরত দারাশিকো (রহঃ) তার শফিনাতুল আউলিয়া কিতাবে লিখেছেন, । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম যখন মুরীদ হন তখন তার বয়স ছিলো ১৬ বছর এবং রওজা কিতাবে সাহেবজাদা মোহাম্মদ বোলাক লিখেছেন, বয়াত গ্রহণের ২০ বছর পরে তিনি খেলাফত লাভ করেন। দেহত্যাগের সময়ে তার বয়স কতো ছিলো তা নিয়ে মতভেদ হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, গরীব নওয়াজের ২০ বছর পর তিনি দেহত্যাগ করেন, অর্থাৎ খেলাফত প্রাপ্তির ২০ বছর পর তিনি দেহত্যাগ করেন। তাহলে ১৬ বছর বয়সে যদি তিনি বয়াত গ্রহণ করে থাকেন এবং ২০ বছর পর । যদি খেলাফত প্রাপ্তি হয়ে থাকেন এবং এর ২০ বছর পর যদি দেহত্যাগ করে থাকেন, । তাহলে পরিস্কার বোঝা যায় তার বয়স ছিলো ৫৬ বছর ।
--------------------------------------------------------
সূচনা
প্রথম মজলিস
____________________________________
প্রেমের জলজ্যান্ত নির্দশন হযরত খাজা শায়খ ফরিদুদ্দীন গঞ্জে শকর অজুধনী (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, এ অধম বান্দার যখন হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন (রহঃ) এর কদমবুসীর সৌভাগ্য অর্জন হলো তখন তিনি কুল্লাহ চাহার তর্কী আমার মাথার উপর রাখলেন, এবং অত্যন্ত দয়া দান করলেন। সেদিন আমি, কাজী হামিদুদ্দীন নাগোরী, মাওলানা আলাউদ্দিন কিরমাণী, সৈয়দ নুরুদ্দীন মোবারক, শায়খ নিজামুদ্দীন আবুল মুয়িদ, মাওলানা শামসুদ্দিন তুর্ক, শায়খ মাহমুদ মোয়ায়না এবং আরও অনেক আসহাবে আহলে সোফ্ ফা খেদমতে উপস্থিত ছিলেন। খাজা কুতুবুদ্দীন (রহঃ) এরশাদ করলেন, পীর বা মুর্শেদ কে এমন শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান হতে হয় । যখন কোন শিক্ষার্থী বয়াত গ্রহণ বা মুরীদ হওয়ার জন্য তার নিকট আসে, তখন তার জন্য ওয়াজেব হয়ে যায় যে, সে একটি মাত্র দৃষ্টি নিক্ষেপের মাধ্যম শিক্ষার্থীর মনে জমাকৃত দুনিয়া প্রেম, লোভ লালসা, ঘৃণা- অহংকার সব এমন ভাবে বিদূরিত করবে যার কণামাত্র থাকবে না । তারপর তাকে বয়াত করে আল্লাহ সাক্ষাতকারী হিসেবে মনোনীত করবে। যদি পীরের মাঝে এ রকম ক্ষমতা না থাকে তা হলে অবশ্যই বুঝবে যে, সে পীর এবং মুরীদ উভয়েই পথভষ্ট ॥ এরপর বললেন, আরেফিন কিতাবে খাজা আবুবকর শিবলী (রহঃ) বর্ণনা করেছেন, বদখ্ শান দেশে এক বুজুর্গ সাথে আমার দেখা হয়েছিল , যার প্রসংশা বর্ণনা করার ভাষা আমার নাই । তিনি অত্যন্ত প্রেমাস্পদ প্রেমিক ও প্রচেষ্টার উৎকর্ষতার নজীরবিহীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং সমস্ত কিছুই সুন্নতের বিধান অনুযায়ী করতেন। আমি তাকে সালাম দিলাম, তিনি সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, বসো, আমি তার নির্দেশানুযায়ী বসে পড়লাম। এবং কয়েকদিন তার সোহবতে (সাথে) কাটালাম । তিনি সবসময় রোজাব্রত পালন করতেন। ইফতারের সময় অদৃশ্যলোক হতে দুটি রুটি আসতো, তিনি সেই রুটি দ্বারা ইফতার করতেন এবং পাথর নিঃসৃত পানি পান করতেন। শহরবাসী তার শিষ্যত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে দরজায় ভিড় জমতো।। এ অবস্থায় তিনি সেখানকার শাসনকর্তাকে নির্দেশ দিলেন একটা খানকা তৈরী করতে। বাদশা তার আদেশকে নিজের সৌভাগ্য মনে করে খানকা তৈরী আরম্ভ করলেন। খানকা তৈরী হওয়ার পর তিনি তাকে সংবাদ দিলেন। । হযরত সে খানকায় তার বাসস্থান স্থান্থান্তর করলেন এবং হুকুম দিলেন প্রত্যেকদিন বাজার হতে একটা করে কুকুর ক্রয় করে নিয়ে আসতে। হুকুম অনুযায়ী প্রত্যেকদিন বাজার থেকে কুকুর ক্রয় করে আনা হলে তিনি সেই কুকুরের হাত (সামনের পা) ধরে সেজদায় বসাতেন এবং বলতেন, তোকে আল্লাহর নিকট অর্পণ করলাম । পরিশেষে ঐ কুকুর গুলো এমন হয়ে গেলো যে, তাদের মধ্যে প্রত্যেকে পানির উপর দিয়ে চলতে পারতো এবং যদি কাউকে কামর দিতো তারা ভালো হয়ে যেত। হযরত খাজা আবুবকর শিবলী (রহঃ) বলেছেন যে, আমি ঐ সব কুকুরদের কারামত (অলৌকিক ক্ষমতা) দেখে আশ্চর্য ও বিস্মীত হয়ে পড়লাম। ঐ বুজুর্গ আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন, "হে শিবলী সেজদার উপর এরা প্রতিষ্ঠ হয়েছে। সেজদার উপর সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তি, যাকে সাহেবে সেজদা বলা হয়, তিনি কারো হাত ধরলে সেও সাহেবে সেজদা হয়ে এমন ক্ষমতাবান হয় যে , যদি সেও কারো হাত ধরে তাহলে সেও সাহেবে সেজদা য় পরিণত করে দেয় ॥ যদি এমন ক্ষমতা তার না থাকে তাহলে সলুকের পথে তার দাবী খাদপূর্ণ বা ভেজালযুক্ত। এরপর এরশাদ করলেন, কামালিয়াত চার জিনিসে সৃষ্টি হয়ঃ- প্রথমতঃ অল্প শয়ন করা, দ্বীতিয়তঃ কম করা , তৃতীয়তঃ সামান্য আহার করা, চতুর্থতঃ মানুষের সাথে কম সম্পর্ক রাখা । এরপর এরশাদ করলেন, গজনীতে এক বুজুর্গ ছিলেন, যিনি চিরকুমার ব্রত পালন করে একাকী আল্লাহর ধ্যানে অত্যন্ত বিভোর থাকতেন। যা কিছু তার কাছে ফতুহাত নজর নিয়জ এর মাধ্যমে আসতো, কিছুই নিজের কাছে কিছুই রাখতেন না । দিনের মধ্যে যা কিছু পেতেন সন্ধ্যের মধ্যে তা বিলিয়ে দিতেন। এবং রাত্রে যা পেতেন তা সকাল পর্যন্ত রাখতেন না , বি লিয়ে দিতেন। ছোট বড় ধনী দরিদ্র বা দরবেশ কেউ তাঁর খানকাহ (ফকির দরবেশদের আশ্রয়) হতে খালি যেতো না। ক্ষুদ্রার্থকে আহার দিতেন, বিবস্ত্রকে বস্ত্র দিতেন এক কথায় বলা চলে তিনি আল্লাহতায়লার আরশীবাদে পুষ্ট (সাবে নি'মত) দরবেশ ছিলেন। আমি তার মূখে শুনেছি, তিনি বলেছিলেন, আমি ৪০ বছর মোজাহেদা করেছি, কিছু হাসেল হয়নি, সামান্য পরিমাণ আলোও নিজের জাতে (অস্তিত্ব) এর মাঝে অনুভব করিনি । যখন কেউ যখন থেকে (উপরে বর্ণীত ) এ চার জিনিস গ্রহণ করেছি তখন হতে এমন আলো পয়দা হয়েছে যে, দৃষ্টি তুলে উপরে তাকালে আরশ এবং হিজাবে আজমত পর্যন্ত কোন জিনিসই দৃষ্টির বাইরে গোপন থাকে না এবং যখন মৃত্তিকার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন মাটির তলার শেষ স্তরের জিনিস পর্যন্তও দেখতে পাই। এ অবস্থা আমার ৩০ বছর যাবৎ , যার জন্য চোখ বন্ধ করে রাখি। এরপর আমার প্রতি মনোনিবেশ করে বললেন, হে দরবেশ, যে পর্যন্ত কম আহার করা, কম শোয়া, কম কথা, এবং মানুষের সঙ্গ না কমাবে সে পর্যন্ত দরবেশীর মহারত্ন লাভ হবে না। তারাই দরবেশের দলভূক্ত যারা শয়ন করাকে হারাম করে দিয়েছে এবং সৃষ্টি বা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাকে বিষধর সর্পের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করেছে। যে দরবেশ দুনিয়াকে দেখাবার জন্য উত্তম পোষাক পরিধান করে, মনে করবে সে দরবেশ নয়, সলুকের পথের ডাকাত , সে মানুষের ঈমান হরণ করে, অর্থাৎ তাকে দেখে মানুষ
সঠিক দরবেশ ভেবে নিজের ঈমান নষ্ট করে। যে দরবেশ নফসের ইচ্ছায় পেট ভরে আহার করে সে দরবেশ নয় । সে নফসের গোলাম । এরপর এরশাদ করলেন, নদীপথে ভ্রমণের সময় এক দরবেশের সঙ্গে দেখা হয়েিলো, তিনি আল্লাহতালার এক অনন্য দান। সাধনার কাঠিন্য তার অবস্থা এমন হয়েছিলো যে, দেহে শুধু হাড় ক' খানাই অবশিষ্ট ছিলো। তাঁর নিয়ম ছিলো, প্রতিদিন চাশতের নামাজ সমাধা করে লঙ্গরখানায় চলে যাওয়া । হাজার মন গমের লঙ্গর হতো, পরবর্তী নামাজের সময় না হওয়া পর্যন্ত লঙ্গর বন্টনে র কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন । হাজার হাজার লোক যারা আসতো তাদেরকে আহার করাতেন, এবং বিবস্ত্রকে বস্ত্র দান করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত লঙ্গর থাকতো বন্টন করতেন। লঙ্গর শেষ হয়ে গেলে জায়নামাজে গিয়ে বসতেন এবং প্রত্যেক দর্শনার্থীকে জায়নামাজের তলা হতে যা তার ভাগ্যে থাকতো বের করে দান করতেন। আমি কয়েকদিন তাঁর সোহব্বতে ছিলাম। তিনি সবসময় রোজা ব্রত পালন করতেন। ইফতারের সময় তাঁর নিকট আলমে গায়েব (অদৃশ্যলোক) হতে ৪ টি খোরমা আসতো--- ২ টি আমাকে দিতেন, ২ টি তিনি নিজে খেতেন । আমাকে বলতেন, যতদিন পর্যন্ত দূনিয়া, দূনিয়ার মানুষ ও জিনিসের বন্ধুত্ব হতে মুক্ত না হবে , অল্প আহার না করবে এবং অল্প শয়ন না করবে, ততদিন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ স্তর বা সোপান লাভ করতে পারবে না। এরপর হযরত কুতুবুদ্দীন (রহঃ) এরশাদ করলেন, হযরত মূসা (আঃ) উপাসনা , একাগ্রতা নির্জনবাসে শ্রেষ্ঠত্বর দাবীদার ছিলেন। যখন তাকে দর্শনের জন্য আসমানে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আওয়াজ এলো, একে পৃথক রাখো, কারণ এর সাথে দূনিয়ার আবর্জনা রয়েছে । হযরত মূসা (আঃ) ভীত হয়ে পরলেন এবং পার্থিব জগতের বস্তু খুজতে দেখতে পেলেন, তার সঙ্গে একটা সূই ও কাসাচুবি (এক ধরনের পাত্র) তিনি নিবেদন করলেন, ইয়া বারে এলাহী, এ গুলি কি করবো? "ওহী এলো, ফেল দাঁও। হে দরবেশ, যখন সামান্য ও নগণ্য জিনিসের জন্য একজন পয়গম্ভর (আঃ) দর্শনে বাধা পেলেন, তাহলে যারা পার্থিব বস্তুর নিকট নিজেকে উৎসর্গ করেছে তাদের উপায় কি হবে ? এরপর এরশাদ করলেন, দরবেশদের কে একা থাকা উচিত কেননা, তাতে তাদের উন্নতি ত্বরান্বিত হয় । এরপর একজন দরবেশের কথা বললেন, তিনি বড় বুজুর্গ ছিলেন, তার নিকট প্রতিদিন করে রহস্য প্রকাশ পেতো। এমনি করে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন রহস্য প্রকাশ পাওয়াতে একসময় আল্লাহর অগণিত রহস্যের দ্বার তার নিকট উম্মুক্ত হয়ে গেলো। পরে খাজা কুতুব হায় হায় করে কেঁদে ফেললেন, এবং বললেন, ঐ বুজুর্গ মূখেই নিম্নোক্ত মসনবীর রুবাই শুনে মুগ্ধ হয়ে পরেছিলাম ।
মসনবী ঃ হর আঁ মুল্ কে কে ওঠাপস্ মিগুজারম
দু সদ মুলকে দিগর দর পেশ দারম ॥
অর্থ ঃ প্রত্যেকবার যখন একটি দেশ সফর করে ফিরে আসি
তখন আমার সম্মূখে দু' শ দেশ উপস্থিত করা হয়।
এরপর এরশাদ করলেন, আহলে সলুক এবং মুতহিরান (ঐশী রহস্যলোকে বিচরণে বিস্ময়াভিভূত ব্যাক্তি) বলেন---তাঁরাই দরবেশ, যারা সবসময় ভ্রমণে বিভিন্ন দেশ অতিক্রম করেছেন এবং সম্মূখে যে দেশ ভ্রমণের প্রস্তুতি নেয় সে দেশের কোন মহামূল্য রত্নটি (বুজুর্গানে দীন ) কোথায় কিভাবে অবস্থান করছেন
তা অবগত থাকেন। কিন্তু সে জগতের সংবাদ হতে যে অজ্ঞ সে অবশ্যই দরবেশ নয়। এরপর এরশাদ করলেন, কিছু সংখ্যক
ওলীআল্লাহ , যারা আল্লাহর গোপন রহস্য প্রকাশ করেছেন তা তাদের অত্যধিক প্রেমে এবং অজ্ঞানতার মাধ্যমে ঘটেছে। অনেকে আবার প্রেমের উম্মত্ততায় কোন গোপন রহস্য ফাস (ব্যাক্ত) করে ফেলেছেন। কিন্তু যারা পরিপূর্ণতার স্তরে অবস্থান করছেন, তাদের নিকট হতে কোন গোপন রহস্য ফাঁস হয়না। সুতারাং বন্ধুত্ব অর্জনের পথে উৎসাহ উদ্দীপনার সহকারে রহস্য গ্রহণ করতে থাকবে কিন্তু প্রকাশ হতে দেবেনা । কেননা, রহস্য হলো বন্ধুর গোপন ভেদ, যে ব্যাক্তি পরিপূর্ণতা লাভ করেন সে কখনও বন্ধুর গোপন রহস্য প্রকাশ করেন না। এরপর এরশাদ করলেন, আমি বহুদিন পর্যন্ত আমার পীড় ও মূর্শেদ হযরত হযরত খাজা মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী (রহঃ) এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম কিন্তু অসতর্ক মূহুর্তেও কোনদিন তাকে বন্ধুর গোপন রহস্য প্রকাশ করতে দেখিনি। অতপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে ফরিদ, পরিপূর্ণ কামেল এমনি হয় যে, তার নিকট হতে কোন অবস্থাতেই বন্ধুর কোন ভেদ প্রকাশ তো হয়ই না বরং নতুন রহস্যের দ্বার উদঘাটন করে নিজের মাঝে গোপন রাখেন।। এরপর এরশাদ করলেন, "হে ফরিদ, যদি মনসুর কামেল হতেন তাহলে অবশ্যই বন্ধুর রহস্য প্রকাশ করতেন না । সুতারাং মনসুর কামেল ছিলেন না বরং এক ফোটাতেই উজ্জল হয়ে উঠেছিলেন এবং বন্ধুর রহস্য প্রকাশ করে দিয়েছেন। প্রতি ফল তার এই হয়েছে যে, অবশেষে তাঁকে ফাঁসিরকাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছে। খাজা গরীব নওয়াজের মনসুর সমন্ধে উক্তিটি নিম্নরূপ
ঃ- মনসুর যে প্রেম - সমুদ্রের এক কাতরা (ফোটা) পানি পান করে নিজেকে আনাল হক (আমি খোদা) বলেছিলেন, তেমনি হাজারো সমুদ্র আমার মাঝে প্রতিনিয়ত বয়ে যাচ্ছে কিন্তু তৃষ্ণা নিবৃত হচ্ছে না (এই অংশটুকু খাজা গরীব নওয়াজের জীবনি হতে সংগৃহীত ) এরপর এরশাদ করলেন, হযরত খাজা জোনায়েদ বোগদাদী (রহঃ) যখন প্রেমসুধা পান করে শান্তীর জগতে অবস্থান করতেন, তখন বলতেন, "হাজারো আফসোস ঐ প্রেমিকদের জন্য যারা (মূখে) বন্ধুত্বের দাবী করে অথচ বন্ধুরনিকট হতে কোন রহস্য উম্নোচিত হলে সাথে সাথেই তা প্রকাশ করে দেয় । এরপর এরশাদ করলেন, " আমি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) এর মূখে শুনেছি এক বুজুর্গ দীর্ঘকাল যাবৎ এবাদত করেছেন এবং অনেক মুজাহিদা (সাধনা) করেছেন। এবাদত ও রিয়াজতের মাধ্যমে তার নিকট একটি রহস্য উদঘাটন হয়, কিন্তু আফসোস তার ধারণক্ষমতা প্রসস্ত ছিলো না, যার ফলে সে এ রহস্যকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি বরং সাথে সাথেই সেই প্রেমের রহস্যকে প্রকাশ করে দেয় এবং প্রকাশ মাত্রই তার নিকট হতে সমস্ত নিয়ামত ছিনিয়ে নেয়া হয় । এই নিয়ামত ছিনিয়ে নেওয়ার দুঃখে সে পাগল হয়ে গেলো, তখন গায়েবী আওয়াজ হলো "হে বান্দা যদি তুমি রহস্য কে প্রকাশ না করতে তহলে দ্বীতিয় রহস্য লাভের যোগ্যতা অর্জন করতে । কিন্তু তোমার মাঝে সে যোগ্যতা ছিলো না, যার জন্য তোমার নিকট হতে তা ছিনিয়ে অন্যকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর খাজা কুতুবুল ইসলাম "ফয়েজ" (দয়া) এর ব্যাখ্যায় বললেন, " হে " ফরিদ, সলুকের পথে এমন এমন ব্যাক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে যারা হাজার হাজার রহস্য নদীর পানি পান করে শান্ত হয়ে বসে আছেন। অতপর এরশাদ করলেন, এক বুজুর্গ অন্য এক বুজুর্গ কে চিঠি লিখেছন , আপনি ঐ ব্যাক্তি সমন্ধে কি মন্তব্য করেন, যে এক কাতরা প্রেমের ঝলকে ঝলসে উঠেন ? দ্বীতিয় বুজুর্গ উত্তরে লিখেছিলেন, দুঃখ হয় তার কম সাহস ও অপ্রসস্ত উৎসাহের জন্য। আসলে লোক এইরূপ হওয়া দরকার, যেনো হাজার হাজার এলাহীর মারফতের দরিয়ার পানি পান করেও হজম করে ফেলে এবং আরো বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করে। আমার এমনই ঘটেছে যে, পঞ্চাশ বছর যাবত উপরোক্ত অবস্থায় অবস্থান করছি এবং আরও বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি । আমি তোমাকে নিষেধ করছি কোন অশুভ চক্রান্তের শিকার হয়ো না। যে বন্ধুর রহস্য প্রকাশ করে দেয় সে দূর্ভাগা । এরপর এরশাদ করলেন, যে পর্যন্ত দরবেশ সব এগানা (আত্মীয়) হতে বেগানা (অনাত্মীয়) না হয় । এবং কঠিন সাধনায় লিপ্ত না থাকে তাহলে দুনিয়ার অপবিত্রতার মধ্যে গ্রেফতার হয়ে যায় । কখনও
নৈকট্যের স্তরে বা মোকাম হাঁসেল হয় না । এরপর এরশাদ করলেন, ৭ বছর এবাদত বন্দেগীর পর যখন হযরত খাজা বায়েজিদ বোস্তামী (রহঃ) কে নৈকট্যের স্তরে নিয়ে যাওয়া হলো, নির্দেশ এলো, একে ফিরিয়ে নিয়ে যাও, সে দুনিয়ার আবর্জনা সঙ্গে এনেছে।
তখন হযরত বায়েজিদ বোস্তমী (রহঃ) নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, একটি মাটির পেয়ালা ও এক টুকরা চামড়া তাঁর খিরকার মধ্যে রয়েছে। তৎক্ষণাত তিনি এগুলি ফেলে দিলেন। তারপর তিনি নৈকট্যের স্তরে স্থান পেলেন । অতপর এরশাদ করলেন, হে ভ্রাতৃবৃন্দ লক্ষ্য করুন যে বায়েজিদের মতো বুজুর্গের যদি এমন তুচ্ছ জিনিসের জন্য জবাবদিহি হতে হয় এবং নৈকটের স্তরে স্থান পেতে বাধাপ্রাপ্ত হতে হয় , তাহলে যারা দুনিয়ার অসংখ্য আবর্জনার মাঝে গ্রেফতার হয়ে আছে তারা কি করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে ?
সলুকের পথ এক জিনিস আর দূনীয়াদারী আরেক জিনিস--এদুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন, একে অপরের শত্রু, তাই এ দু বস্তুকে একত্র করা যায়না। এরপর এরশাদ করলেন, দরবেশ যখন কামেল হয়ে যায় তখন যা কিছু আদেশ করে তাই হয়ে যায় । এর সামান্যতম ব্যাতিক্রমও ঘটে না । এরপর এরশাদ করলেন, আমি এবং কাজি হামিদুদ্দীন নাগুরী, যিনি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু, নদী পথে ভ্রমণ করছিলাম, সেখানে কুদরতে এলাহীর এক অত্যাশ্চর্য জিনিস অবলোকন করলাম , যা বর্ণনা করা কঠিন। নদীর নিকটবর্তী একটা বাড়ী ছিলো, আমি এবং কাজি হামিদুদ্দীন দু 'জনে একসাথে সেখানে বসে ছিলাম । একটু গরম অনুভব হলো, হঠাৎ একটি ছাগল দুটো রুটি মুখে করে এনে আমাদের সম্মূখে রেখে চলে গেলো। আমরা দু' জনে খেলাম এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলাম , এটা প্রকৃত ছাগল ছিল না , ফেরেস্তাদের মধ্যে হতে কেউ ছিলো । কথার মাঝখানে একটা বৃহৎ আকারের বিচ্ছু নজরে পড়লো, সে নদীর দিকে যাচ্ছিলো। নদীর তীরে পৌঁছে নিজের শরীর পানিতে নিক্ষেপ করে সাতরিয়ে ওপারে চললো। আমরা এ দৃশ্য দেখে হতভন্ব হয়ে গেলাম । কাজি সাহেব কে বললাম , নিশ্চয়ই এর মধ্যে এলাহীর রহস্য লুকায়িত রয়েছে ।
ব্যাপার টা দেখার জন্য উঠে পরলাম এবং নদীর দিকে চলতে লাগলাম । নদীর কিনারায় পৌছে দেখি , নদীতে অত্যাধিক স্রোত কিন্তু পার হওয়ার জন্য কোন নৌকা বা অন্য কোন প্রকার জিনিস নেই ।
যার মাধ্যমে ওপারে যেতে পারি । আমরা অসহায় ছিলাম, তাই এলাহীর দরবারে দোয়া করলাম, হে খোদা যদি আমরা আপনকর্মে কামেল হয়ে থাকি তাহলে নদীর মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য রাস্তা দাও , হঠাৎ নদীর মাঝখানে পানির মধ্যে ফাটল ধরলো এবং পথ তৈরী হয়ে গেলো। আমরা সেই পথ দিয়ে নদী অতিক্রম করলাম।
বিচ্ছু আমাদের আগে আগে চলতে ছিলো এবং একটা গাছের নীচে যেয়ে থাম লো। সেখানে একজন লোক শুয়ে ছিলেন, এবং একটা বৃহৎ অজগর লোকটিকে দংশন করার জন্য গাছের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল । বিচ্ছু সাপটার কাছে পৌছেই ছোবল মারলো। দংশনের সাথে সাথেই মারা গেলো এবং বিচ্ছুও অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমরা দু' জন সাপটার কাছে
যেয়ে দেখলাম এবং অনুমান করলাম সাপটার ওজন প্রায় হাজার মন হবে। আমরা লোকটার জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম ইচ্ছা আলাপ করবো। তার উঠতে দেরি দেখে সামনে এগিয়ে গেলাম। দেখে মনে হলো লোকটা মদখোর, মদ্যপানের জন্য বমি করে বেঁহুশ হয়ে পরেছিলো। আমাদের দুঃখ হলো অযথা কষ্ট করলাম এবং আশ্চর্য হলাম এই ভেবে যে এমন নাফরমাণ লোকের জন্য আল্লাহ তায়লা এমন করুনা করলেন এবং এত বড় বিপদ থেকে রক্ষা করলেন। এ চিন্তা যখন মনের মধ্যে ঘোরপাক খাচ্ছিলো তখন গায়েবী আওয়াজ হলো,
আমি প্রতিপালক হয়ে যদি শুধু ভালোর প্রতি মনোযোগ দেই তাহলে গরীবের বন্ধু কে হবে ? আমরা যখন এই কথা শোনার জন্য নিবিষ্ট ছিলাম তখন লোকটি জাগ্রত হলো । নিজের কাছাকাছি মৃত অজগরকে দেখে সে অত্যন্ত ভীত ও অবাক হয় গেলো। আমরা তাকে সাপ ও বিচ্ছুর সকল কাহিনী বর্ণনা করে শুনালাম। সে স্বীয় কর্মের জন্য অত্যান্ত দুঃখিত হলো এবং সাথে সাথে তওবা করলো। আমরা চলে এলাম এবং অনতিকাল পরেই শুনতে পেলাম যে , উক্ত লোকটি উচু মাপের একজন বুজুর্গ হয়েছেন এবং আল্লাহর বন্ধুত্বে স্থান পেয়েছেন।
খালি পায়ে হেঁটে ৭ বার হজ্বব্রত পালন করেছেন। এরপর এরশাদ করলেন, যখন ভালো হবার সময় হয় তখন আল্লাহর দানও সঙ্গলাভ করে। বাতাসের সাথেও তখন প্রেমের পরশ চলতে থাকে । তিনি মহাক্ষমতা বান , তিনি চাইলে অগ্নীপূজারী, মদ্যপায়ী বা যাকে খুশী তাকে এক মূহুর্তে সেজদাকারীদের দলে অন্তভূক্ত করতে পারেন। আবার যখন দুভার্গ্য সঙ্গে অবস্থান করে তখন সুগন্ধযুক্ত মৃদু হাওয়াও প্রভুর শান্তি বহন করে চলতে থাক ।
হাজারো সেজদাকারী নষ্ট হয়ে যায় । হে ভ্রাতৃবৃন্দ , স্মরণ রেখো, আল্লাহতালার নিকট কখনও নির্ভীক হতে নেই । কেননা, পরিনাম বা ভবিষৎ কারো জানা নেই , এবং কেউ জানতেও পারে না । এরপর এরশাদ করলেন, ইবলিশ যদি তার কর্মের পরিণাম জানতো তাহলে নিঃসন্দেহে সে আদম (আঃ) কে সেজদা করতো । সুতারাং বুঝাই যাচ্ছে তার পরিণাম জানা ছিলো না । সে তার নিজের সাধনার কথা চিন্তা করে অহংকারী হয়েছিলো, তাই মাটিকে (আদমকে) সেজদা করা সম্মানের হানী বলে বিবেচনা করেছে, এবং সেজদা না করার জন্য অর্থাৎ হুকুম পালন না করার জন্য তার সমস্ত সাধনা তার দিকে ছুরে মারা হয়েছে । যার ফলে আল্লাহতায়লার দরবারে সে অভিসপ্ত হয়েছে । এরপর এরশাদ করলেন, আমি কোন এক শহরে দেখেছিলাম যে কোথাও দশজন বিশজন লোক একত্রে দাঁড়িয়ে রহস্যলোকের রহস্যে স্তম্ভিত ও অচৈতন্য হয়ে আছে , কিন্তু নামাজের সময় হলে তারা চেতনার জগতে ফিরে আসতো, আবার নামাজ শেষ হলেই মত্তার জগতে ফিরে যেতো। আমি তাঁদের খেদমতে বহুদিন ছিলাম । একদিন তাঁদের দলের কয়েকজন লোকের চেতনা ফিরে এলো । আমি তাঁদের নিকট আবেদন (আরজ) করলাম, আপনাদের এমন অবস্থা কত দিন যাবত ? তারা জানালেন, ৬০/৭০ বছর হবে, যেদিন আল্লাহর দরবারে ইবলিশের অভিসপ্ত হওয়ার কিচ্ছা শুনেছিলাম সেদিন হতেই আমাদের এ অবস্থা। এরপর হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম হায়, হায় করে কাঁদতে লাগলেন। তারপর বললেন, কামেলগণ এর চেয়েও অধিক । "ফয়েজ" লাভ করে থাকেন। ঐ লোক গুলি নিজেদের হালেই নিজেরা বিভোর রয়েছে । আমি জানি না যে আমি কোন দলের অন্তভূক্ত ! এরপর হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম দাঁড়িয়ে গেলেন। মজলিস সমাপ্ত হলো। হযরত খাজা সাধনার জগতে তন্ময় হলেন ।
আলহামদুলিল্লাহ আলা জালেক ।
____________________________________
দ্বিতীয় মজলিস
রোজ বৃহস্পতিবার , ৪ তারিখ, শাওয়াল মাস, ৬৪৮ হিজরী। কদমবুসীর ঐশ্বর্য লাভ হলো । কাজী হামিদুদ্দীন নাগুরী, মাওলানা শামসুদ্দীন তুর্ক ও অনেক প্রখ্যাত সুফী খেদমতে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা আহ্ লে সলুক সমন্ধে শুরু হলো । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম এরশাদ করলেন, সলুকের পথ তাকেই বলে, যে পথ দৃঢ় থাকলে সালেকের পা হতে মাথা পর্যন্ত প্রেম দরিয়ায় এমন ভাবে নিমর্জিত থাকে, তার নিকট এমন একটি মূহুর্তও অতিবাহিত হয় না । যে, অদৃশ্যলোক হতে ইশক্ ও মহব্বত তার সত্তাকে আকর্ষিত না করে । এরপর বললেন, সদাসর্বদা হাজারো অভূতপূর্ণ অবস্থা
যার ওপর প্রকাশ পায় সে-ই আরিফ । সে প্রেম-জগতের অতল তলে এমন ভাবে বিলিন হয়ে থাকে যে, বিশ্বের সমস্ত কিছু তার বুকের ওপর সংস্থাপন করলেও সে গুলো ফেলে দেয়ার উপলব্ধি করবে না। এরপর এরশাদ করলেন, সমরকন্দে এক বুজুর্গের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি ঐশী- বিশ্ময়ালোকে বিশ্ময়াবিষ্ট ছিলেন। আমি সেখানকার অধিবাসীদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম , উনার এ বিলীন অবস্থা কত দিন যাবৎ ? তাঁরা উত্তর দিলো , আমরা ২০ বৎসর যাবৎ উনাকে এ অবস্থায় দেখছি । আমি তার সাথে কয়েকদিন কাটালাম । একদিন তাঁকে স্বাভাবিক অবস্থায় পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কতদিন যাবত আপনি বস্তুজগতের খবর হতে মুক্ত ? উত্তরে তিনি বললেন, ওহে নাদান (নির্বোধ), দরবেশ যখন প্রেমসাগরে নিমজ্জিত থাকেন তখন তার ওপরে হাজারো
জগত হতে যদি হাজারো বস্তুও নিপতিত হয়, সেগুলোর সংবাদ রাখার অবকাশ কোথায় ? এমন কি এ অবস্থায় তাঁকে কেটে টুকরা টুকরা করলেও চৈতন্যোদয় হবে । না । হে দরবেশ, এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো যে এটা ইশক্ -এর পথে বাজিখেলা । যে, ব্যাক্তি এ পথে পা রেখেছে সে নিজের জানকে নিরাপদে নিয়ে যেতে পারে না। এরপর এরশাদ করলেন, যখন হযরত ইয়াহ্ ইয়া (আঃ) এর গলার ওপর শত্রু ছুরি বসিয়ে কাটতে আরম্ভ করলো তখন তীব্র ও অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ইচ্ছা করলেন যে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাবে, সাথে সাথে জিব্রাইল (আঃ) তাঁর কাছে পৌছলেন এবং বললেন, আল্লাহতায়লা আদেশ করেছেন যদি আপনি উহ্ শব্দটিও করেন তাহলে কিতাব হতে আপনার নবী নাম মূছে ফেলা হবে । হযরত ইয়াহ্ ইয়া (আঃ) এই নির্দেশ পাওয়ার পর উহ্ বা আহ্ কোন প্রকার শব্দও করেননি এবং অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে "জান" জানের মালিকের নিকট সমপর্ণ করেছেন। এরপর এরশাদ করলেন , অনুরূপ ভাবেই হযরত জাকারিয়া (আঃ) কে চিরে ফেলার জন্য যখন তাঁর মাথার ওপর করাত সংস্থাপন করে চিরে ফেলতে লাগলো, তিনিও তখন বর্ণানীত অসহ্য যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে চইলেন, কিন্তু পূর্বের ঘটনার মতোই হযরত জিব্রাইল (আঃ) উপস্থিত হয়ে আল্লাহতায়লার ফরমাণ (আদেশ) শোনালেন। তিনি হুকুম অনুযায়ী ততক্ষণ পর্যন্ত নীরব রইলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত করাত তাঁর প্রবিত্র দেহকে দ্বিখন্ডিত না করলো । এ ঘটনা বলার পর হযরত । খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এর পবিত্র চোখে অশ্রু দেখা দিলো।
পূনরায় বললেন, যে ব্যাক্তি বন্ধু প্রেমের দাবী করে এবং কষ্টের সময় ফরিয়াদ করে, সে প্রকৃত প্রমিক নয় বরং মিথ্যাবাদী ও ভন্ড । কেননা, বন্ধুত্ব গ্রহণ করার অর্থই হলো যে বন্ধু নিকট হতে যা কিছুই আসবে তাকে নেয়ামত হিসাবে গ্রহণ করতে হবে এবং মনে করতে হবে , যে কোন উপলক্ষেই হোক আল্লাহ আমায় স্মরণ করেছেন। এরপর এরশাদ করলেন, হযরত রাবেয়া বসরী (রহঃ) এর রীতি ছিলো, যে দিন তাঁর উপর কোন দুঃখ-কষ্ট নাজেল হতো সেদিন অত্যন্ত সন্তুষ্ট থাকতেন এবং বলতেন বন্ধু আমায় স্মরণ করেছেন। যে দিন বালা নাজেল হতো না সেদিন দুঃখে কাতর হয়ে বলতেন, কি কারণে আল্লাহ আজ আমাকে স্মরণ করলেন না ?
আমি হযরত খাজা বুজুর্গ মঈনুদ্দিন হাসান সঞ্জরী (রহঃ) এর মূখে শুনেছি যে, প্রেম তারই করা উচিত যে বন্ধুর দুঃখ-কষ্টে সবুর করতে পারে । বন্ধু প্রদত্ত দুঃখ বন্ধুর জন্যই হয়ে থাকে । সলুকের পথে বন্ধু হতে আসা বালা নিয়ামত স্বরূপ , যে দিন কারও প্রতি তা নাজেল না হয়, সেদিন বুঝতে হবে যে তার উপর হতে নেয়ামত তুলে নেয়া হয়েছে ।
মা বালা বর কাসে কাযা নাকুনেম ,
নামে আওর অযে আউলিয়া নাকুনেম॥
ই বালা গাওহারে খাজানায়ে মাস্ ত,
গাওহারে খোদ বকাস আতা নাকুনেম ॥
অর্থঃ-আমরা কোন বিপদ মুসিবতকে এড়িয়ে যাইনা
তাদের নাম বন্ধুত্বে অস্বীকার করি না
এ বিপদ আমাদের সম্পদ-ভান্ডার
নিজের সম্পদ অন্যকে দান করি না ।
হযরত খাজা এরপর একটা ঘটনা বর্ণনা করলেন, ময়দানে গায়েব (অদৃশ্য ব্যাক্তি ) সমন্ধে । তিনি বললেন, মানুষ যখন ফেরেস্তাদের মতো পরিপূর্ণ প্রবিত্রতার অধিকারী হয় তখন ফেরেস্তা তাকে আহবান করে।
তিনি সে শব্দ শ্রবণ করে তাদের দিকে চলতে থাকে এবং কাছে যেয়ে তাদের সঙ্গে মিশে যায় । এরপর এরশাদ করলেন, শায়খ ওসমান সঞ্জরী নামে আমার এক বন্ধু এবং পীর ভাই ছিলেন, এবাদত বন্দেগী ও রোজা পালনে তিনি ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা । তিনি তাঁর কর্মে যখন পরিপূর্ণতা বা কামলিয়াতের স্তরে সুদৃঢ় হলেন তখন ফেরেস্তা তাঁর সাথে দেখা করে দলভূক্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করলো।
তিনি তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। একদিন আমার সঙ্গে বন্ধুদের মজলিসে বসেছিলেন, ফেরেস্তা আহবান করলো, শায়খ এসো আমরা যাই। তিনি লাব্বায়েক বললেন, এবং আমার নিকট হতে তাদের দিকেচলে গেলেন । কিন্তু কোথায় গেলেন তা জানি না । এরপর এরশাদ করলেন, আমি এবং কাজী হামিদুদ্দীন নাগুরী কাবা শরীফ তাওয়াফে রত ছিলাম, আমাদের সমূখে ছিলেন হযরত শায়খ ওসমান (রহঃ), যিনি হযরত শায়খ আবুবকর শিবলী (রহঃ) এর বংশধর ছিলেন, এবং বড় বুজুর্গ ছিলেন । আমরা তাঁর সামান্য পিছনে থেকে তাঁর পায়ের ছাপ অনুস্মরণ করে চলছিলাম । তিনি তাঁর স্বচ্ছ হৃদয় দ্বারা আমাদের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, আমার প্রকাশ্য অনুস্মরণ করে লাভ কি ? যদি পারো তো আমার বাতেনী (অপ্রকাশ্য) অনুস্মরণ করো । আমরা নিবেদন করলাম , আপনার বাতেনী অনুস্মরণ কি প্রকারের ?
তিনি বললেন, প্রতিদিন এক হাজার বার কোরান শরীফ খতম করা । আমি এবং কাজি হামিদুদ্দীন নাগুরী উভয়ে তাজ্বব হয়ে গেলাম এই ভেবে যে, এ কাজ কোন মানব সন্তানের দ্বারা সম্ভব নয়, নিশ্চই মনে হয় প্রত্যেক সুরায় প্রথম আয়াতটা পাঠ করে থাকেন । আমরা যখন এই চিন্তা করলাম তখন তিনি মূখ ঘুরিয়ে আমাদের তাকিয়ে বললেন, তোমরা যা মনে করলে তা ভুল । কারণ, আমি প্রতিদিন এক হাজার বার কোরান শরীফের প্রতিটি অক্ষর একটার পর একটা পাঠ করে থাকি ।যখন এ ঘটনা বর্ণনা হচ্ছিল তখন মাওলানা আলাউদ্দিন কিরমাণী বললেন, তার আমার জ্ঞানের ধারণ ক্ষমতার বাইরে । এটা হয়তো কোন কারামত হবে , খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এর চোখে অশ্রু দেখা দিলো, এবং বললেন, যে ব্যাক্তি মাকামে আলীয়াতে অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতর স্তরে পৌছেছে সে নিজের নেক আমল দ্বারাই পৌঁছেছে । আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যেকের জন্য উম্মুক্ত , কেউ গ্রহণ করে , কেউ করে না । চেষ্টা ও কঠোর সাধনার মাধ্যমে অনুগ্রহকে সম্ভল করে শ্রেষ্ঠ স্তরে পৌছতে হয় ।
পরবর্তী আলোচনা মজলিসে আদব সমন্ধে বর্ণনা করলেন, হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম(রহঃ) এরশাদ করলেন, মজলিসে প্রবেশ করে যেখানে জায়গাল খালি পাবে সেখানেই বসে পড়বে , কেননা, আগতদের জন্য শূন্য স্থানই নির্দিষ্ট থাকে। এরপর এরশাদ করলেন, আমি অধম আজমির শরীফে মাওলানা সালাউদ্দীন (রহঃ) এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম , আমার মুর্শেদ হুজুর (রহঃ) ও উক্ত মজলিসে ছিলেন। বালা সমন্ধে আলোচনা চলছিলো, মাওলানা সালাউদ্দীন (রহঃ) এরশাদ করলেন, একবার পয়গম্ভর (আঃ) কোথাও গিয়েছিলেন, সেখানে সাহাবীগণ ঘরের মধ্যে তাকে বেষ্টন করে বসে ছিলেন। পরে আরও তিনজন লোক আসলো, তাদের মধ্য হতে একজন রসূলে মকবুল (দঃ) এর বেষ্টনীর মাঝে স্থান পেলেন, অপর দু জনের বসার মতো জায়গা ছিল না , তাদের মধ্যে একজন বেষ্টনীর বাইরে বসল, অপর জন চলে গেল। তখন জিব্রাইল (আঃ) উপস্থিত হয়ে বললেন, হে নবী, আল্লাহতায়লা নির্দেশ দিয়েছেন, যারা এই বেষ্টনীর মধ্যে বসে আছে তাদেরকে ক্ষমা করা করেছেন, এবং যে ব্যাক্তি বেষ্টনীর বাইরে বসে আছে তাঁকেও আল্লাহ তাঁর করুনা ও দয়া দ্বারা ক্ষমা করেছেন, কিন্তু
যে ব্যাক্তি চলে গেছে সে দুর্ভাগা ।সে মূখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আল্লাহর রহমত ও তাঁর নিকট হতে মূখ ফিরিয়ে নিয়েছে । এরপর এরশাদ করলেন, যে আবু লায়ছা লিখিত ""তম্ভীহ"" কিতাবে উল্লেখ আছে যে ব্যাক্তি মজলিস পাবে অথচ বসবে না সে অভিসপ্ত (মালউন) । পরবর্তী আলোচনা পদক্ষেপ সমন্ধে শুরু হলো । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এরশাদ করলেন, পদক্ষেপ দুই প্রকার (১) নফ্ সে নেক বা পবিত্র বাসনা (২) নফ্ সে বদ বা অন্যায় বাসনা । খোদা যেন করো জন্য নফ্ সে বদ বা অন্যায় বাসনা নির্ধারণ না করেন । এরপর এরশাদ করলেন, আমি হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর মূখে শুনেছি , তিনি বলছিলেন, একদিন আমি এবং হযরত খাজা ওসমান হারুণী (কুঃ সেঃ) এক জায়গায় বসেছিলাম, । এমন সময় আমার পীর ভাই শায়খ বুরহানুদ্দীন চিশতী সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর চেহারায় অস্তিরতা প্রকাশ পাচ্ছিলো হযরত খাজা ওসমান হারুণী (কুঃ সেঃ) এরশাদ করলেন, হে বোরহান, আজ তোমার মন এতো খারাপ কেন ? সে আরজ করলো, আমি আমার এক প্রতিবেশীর ব্যাবহারে অতিষ্ঠ হয়ে পরেছি, সে নিজের বাড়ীকে এমনভাবে দোতলায় পরিবর্তন করেছে যার ফলে আমার মেয়ে মহলের পর্দা ও গোপীয়তা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পরেছে । খাজা ওসমান হারুণী (কুঃ সেঃ) জিজ্ঞেস করলেন, সে কি জানে তুমি আমার
মুরীদ ? বোরহানুদ্দিন বললো , আমি যে আপনার মুরীদ সে তা জানে । হুজুর এ কথা শোনার পর বললেন, তাহলে সে এখনও দ্বিতল হতে ভূপাতিত হয়না কেন ? এসময়ে বোরহানুদ্দীনের বাড়ীর এক লোক মজলিশ হতে তাঁর প্রয়োজনে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। সে পথিমধ্যে শুনতে পেল যে দ্বিতল হতে ভূপাতিত হয়ে ঐ পরশীর ঘাড় ভেঙ্গে গেছে । এরপর খাজা কুতুব এরশাদ করলেন, আমি আজমীর শরীফে হযরত খাজা বুজুর্গের খেদমতে হাজির ছিলাম, সে সময় রাজা পৃথীরাজের রাজত্ব ছিলো । রাজা সব সময় খাজা বুজুর্গের ক্ষতি সাধনে সচেষ্ট থাকতো, এবং চাইতো যে, এমন কিছু ঘটুক যার কারণে হুজুর আজমির ছেড়ে চলে যান । সবসময় সে সবার সাথে ষড়যন্ত্র করতো । এ খবর যখন হযরত খাজা বুজুর্গের পবিত্র কানে পৌছলো তখন তিনি মোরাকাবায় ছিলেন । মোরাকাবা হতে অবসর হয়ে এরশাদ করলেন, আমি পৃথীরাজকে মুসলমানদের হাতে জীবিত বন্দি অবস্থায় অর্পণ করলাম । এ ঘটনার কিছুদিন পরেই সুলতান শাহাবুদ্দীন ঘোড়ীর সৈন্যগন পৃথ্বীরাজকে আক্রমণ করলো এবং যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ পরাজিত হয়ে জীবিত বন্দি হলো। সুতারাং বুঝতে হবে যে দরবেশের একটি কথায় আগুন জ্বলে উঠে এবং অপর কথায় আগুন নিভে পানি হয়ে যায় ।
মালেক ইখতিয়ারউদ্দিন আইবেক একটা ছোট শহরের শাসন কর্তা ছিলেন। সে বাদশাহের নির্দেশে হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহঃ) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে কদমবুসী করলেন, এবং হযরত খাজা সেখানে বাস করতেন অনুরূপ কয়েকটি নিস্কর গ্রাম উপঢৌকন (নজরানা) দেয়ার প্রস্তাব পেশ করলেন । হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন উপস্থিত ব্যাক্তিদের উদ্দেশ্যে বললেন, এই ধরনের কাজ আমাদের পীরগনের রীতি বিরুদ্ধ । কোন নিস্কর জায়গা অথবা কোন প্রকার নজর গ্রহণ করলে দুনিয়াতে তাঁর স ম্পত্তি বৃদ্ধি হয়, সেটা আমাদের জন্য
শাস্তি স্বরূপ । এরপর তিনি স্বীয় জায়নামাজের একটা কোনা উত্তোলন করে মালেক এখতিয়ারউদ্দিনকে ডেকে এরশাদ করলেন, এদিকে তাকাও এবং উপস্থিত অন্যদেরকেও বললেন, তোমরাও এদিকে দেখ। প্রত্যেকে জায়নামাজের নিচে তাকিয়ে দেখলেন, আল্লাহর রত্নভান্ডার নহর (নদী) , তাঁর জায়নামাজের তলা দিয়ে প্রভাহিত হচ্ছে । তিনি মালেক এখতিয়ারউদ্দীন আইবেকের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে বললেন, হে আইবেক , যার নিকট ল্লাহর রত্নভান্ডারের নদী মজুদ রয়েছে তাঁর এ ক'টি গ্রাম উপঢৌকন নিয়ে কি হবে ? এ উপহার ফেরত নিয়ে যাও এবং বাদশাহ কে বলে দিও , যেন ভবিষ্যতে দরবেশদের প্রতি এমন দৃষ্টতা ও অভদ্রোচিত ব্যাবহার না করে , তা না হলে এমন কাজের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে । এরপর এরশাদ করলেন, হযরত খাজা মঈনুদ্দিন হাসান চিশতী সঞ্জরী কাদ্দাসাল্লাহু সাররাহু, শায়খ আহাদুদ্দীন কিরমাণী (রহঃ) শায়খ শিহাবউদ্দীন ওমর সোহ্ রাওয়ার্দী (রহঃ) এবং আমি একত্রে উপবিষ্ট ছিলাম । আম্বিয়া আলায়হেস সালাম সমন্ধে কথা চলছিলো, এমন সময় সুলতান গিয়াসউদ্দিন মুহম্মদ ঘোড়ী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে হঠাৎ আমাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলো, বুজুর্গের দৃষ্টি তার প্রতি নিপতিত হলো। খাজা বুজুর্গ বললেন, এই ছেলে একদিন দিল্লির বাদশাহ হবে এবং যে পর্যন্ত দিল্লির ক্ষমতা হস্তগত না করবে সে পর্যন্ত তার মৃত্যু হবে না । পরবর্তীকালে খাজা বুজুর্গের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছিল । এরপর এরশাদ করলেন যে, আল্লাহর নিকট সম্মানিত (বুজুর্গ) ব্যাক্তিদের বাক্যের মর্যাদা আল্লাহতায়লা এমনই ভাবে দিয়ে থাকেন। পরবর্তী আলোচনা ছিলো বয়াত সমন্ধে । তিনি এরশাদ করলেন, । দ্বিতীয়বার বয়াত গ্রহণ করা জায়েজ (সিদ্ধ) আছে । যদি কোন লোক তার পীরের নিকট হতে চলে আসে তাঁর দিক হতে মূখ ফিরিয়ে নেয় অথবা তাঁর তওবা যদি নির্ভেজাল বা সন্দেহমুক্ত না হয়, তাহলে সে দ্বীতিয় বার বয়াত গ্রহণ করতে পারে এবং করতে হয় । যদি না করে তাহলে প্রথম বয়াত বাতিল হয়ে যায় । এরপর এরশাদ করলেন, শায়খ সায়ফুল ইসলাম বোরহানুদ্দীন (রহঃ) বিরচিত রওজা কেতাব বর্ণীত আছে যে, হযরত খাজা হাসান বসরী (রহঃ) রওয়ায়েত করেছেন, হযরত রসূলে খোদা (সাঃ) যখন মক্কা বিজয় করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন তখন দূত হিসেবে প্রথমে হযরত ওসমান (রাদিঃ) কে মক্কা বাসীদের নিকট প্রেরণ করলেন । তিনি রওয়ানা হয়ে যাওয়ার পরপরই শত্রুপক্ষ গুজব ছড়াতে লাগলো হযরত ওসমান (রাদিঃ) কে মক্কা শরীফে শহীদ করা হয়েছে। রসূললে মকবুল (সাঃ) যখন এ সংবাদ শ্রবণ করলেন তখন সকল সাহাবীকে (রাদিঃ) একত্রিত করে নির্দেশ দিলেন, মক্কা বাসীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য নতুন ভাবে বয়াত গ্রহণ করো। সকলেই হুজুরে পাক (সাঃ) এর হাতে বয়াত গ্রহণ করলেন, এ সময় হুজুর করিম (সাঃ) একটা গাছের গুঁড়ির সাথে ঠেস দিয়ে বসেছিলেন, যে জন্য এ বয়াত কে বয়াতে । শাজারা (গাছ) বা বয়াতে রেদওয়ান বলা হয় । এরপর হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম আদামাল্লাহু বাকাউহু এরশাদ করলেন, তাহলে বুঝতে পারলে তো যে, প্রয়োজনে সাহাবা (রাদিঃ) গণও নতুন ভাবে বয়াত গ্রহণ করতেন। এরপর আমি ( শায়খ ফরিদ) আবেদন করলাম যে, যদি পীরকে উপস্থিত না পাওয়া যায় এবং তওবার মধ্যেও । সন্দেহ দেখা দেয় তখন কি করা ওয়াজেব (কর্তব্য ) ? । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমীন এরশাদ করলেন যে, নিজের পীরের কাপড় সামনে রেখে কাপড় সামনে রেখে ঐ কাপড় হতে বয়াত গ্রহণ করতে হবে । এরপর বললেন, আমি আমার মূর্শেদকে কয়েকবার এরূপ করতে দেখেছি এবং কখনও কখনও আমি নিজেও করেছি আ । এরপর মুরীদের বিশুদ্ধ বিশ্বাস সমন্ধে একটি ঘটনা বর্ণনা করলেন, বললেন বাগদাদ শরীফে এক দরবেশকে সন্দেহ করে কাজির সমূহে উপস্থিত করা হলো , কাজি সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করার পর দরবেশকে হত্যা করার আদেশ দলো। জল্লাদ কতলের হুকুম পাওয়ার পর বদ্ধভূমিতে নিয়ে গেলো। নিয়ম অনুযায়ী দরবেশকে কেবলামূখী করে হত্যা করত উদ্ধত হতেই
দরবেশ মূখ ঘুরিয়ে স্বীয় পীরের আস্তানার দিকে করে নিলো । জল্লাদ বললো , মৃত্যুর সময় মূখ কেবলার দিকে করা দরকার । দরবেশ বললো, তুমি তোমার নিজের কাজ করে যাও; আমি আমার মূখ আমার কেবলার দিকে করে নিয়েছি । উভয়ে এ বাক-বিতন্ডায় নিয়োজিত ছিলো, এমন সময় দূত খলিফার আদেশ নিয়ে এলো যে, আমি দরবেশের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি , তাকে মুক্ত করে দাও । খাজা কুতুব (রহঃ) এ ঘটনা
বলার পর বললেন, দেখ তাঁর বিশুদ্ধ আক্বিদা (বিশ্বাস) তাঁর অবধারিত মৃত্যু হতে তাকে উদ্ধার করলো । এরপর এরশাদ করলেন, হযরত খাজা মঈনুদ্দিন হাসান চিশতী (রহঃ) সূফীদের মধ্যে বসেছিলেন, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছিলো । যখন তাঁর মূখ এক বিশেষ দিকে ঘুরে যেতো তিনি তখনই দাঁড়িয়ে যেতেন। অবশেষে দেখা গেল যে, তিনি । সেই মজলিসে ১১০ বার এ ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সব আসহাবে সুফ্ ফা এ কারণে বিস্মিত ও কৌতূহলী হয়ে উঠে ছিলেন। তাদের সকলেই বুঝতে পেরেছিলো যে, এর পেছনে নিঃশ্চয়ই কোন গুরু রহস্য লুকায়িত আছে । কিন্তু আদবের খেলাফ হবে। এই কথা ভেবে কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারেনি । যখন মজলিস হতে চলে গেলেন তখন আমি তাঁর এক বিশেষ খাদেমকে বললাম, উপযুক্ত সময় বুঝে হুজুরের নিকট হতে জেনে নিবেন । পরে তিনি একদিন সময় বুঝে হুজুরের নিকট হযরত খাজা বুজুর্গকে উক্ত ঘটনার রহস্য উন্মোচন করার জন্য আরজ করলেন। তিনি এরশাদ করলেন, ঐ দিকে আমার মূর্শেদের হাজার পবিত্রতা বিজরিত রয়েছে, যখন আমার দৃষ্টি ঐ দিকে নিবন্ধ হতো আমি তাঁর সম্মানে প্রদর্শনে দাঁড়িয়ে পরতাম। এরপর এরশাদ করলেন, পীরের উপস্থিতি ও স্মরণে মুরীদকে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত
এবং যখন পীর পরলোক গমন করবেন সেই সময় আরও বেশী আদব করা উচিত। পরবর্তী আলোচনা " সামা " (বিশুদ্ধ গান ) কে ন্দ্র করে শুরু হলো । এরশাদ করলেন , সামায় যে মজা আছে তা অন্য কোন বস্তুতে নাই এবং সেই অবস্থা এমন যে, "সামা" ব্যাতিত অন্য কিছুর মাধ্যমে হাসেল করা সম্ভব নয় । এরপর এরশাদ করলেন যে, আমি এবং কাজি হামিদুদ্দীন নাগুরী, শায়খ আলী সঞ্জরী (রহঃ) এর খানকায় অবস্থান করছিলাম । সেখানে সামার মজলিস বসলো । কাউয়ালগণ নিন্মক্ত শের গাইতে শুরু করলো-
কুশতাগানে খনজরে তসলীম রা
হর জমাঁ আয গায়েবে জানে দীগারাস্ত ॥অর্থঃ- প্রেমের তরবারিতে যারা খন্ড বিখন্ড হয়েছে তাঁরা প্রতিমূহুর্তে অদৃশ্য হতে নবজীবন লাভ করে ॥
এগানে কাজি হামীদুদ্দীন ও আমার ওজ্ দ্ (ঐশী প্রেমাকর্ষণে মূর্ছাগত হওয়া ) এমন বৃদ্ধি পেলো যে, তিনরাত তিনদি ন তিনরাত এ অবস্থাতেই বিভোর ছিলাম । অচৈতন্য ও বিবশতায় নিমজ্জিত হয়ে যাই আমরা এ গানের কথা ও সুরের মূর্ছনায় ! যখন আমাদের স্বভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো তখন আমারা কাওয়ালদের, কে সঙ্গে নিয়ে নিজ আবাসে ফিরে এলাম । কাওয়ালদের বললাম , ঐ গান পূনরায় গাইতে , তাঁরা ঐ গান গাইতেই আমরা জাগতিক চেতনা হতে বিমুক্ত হয়ে অচৈতন্যলোকে গমন করলাম। একাধারে চার অহরাত্র এ অবস্থায় পরেছিলাম । নামাজের সময় হলে চেতনা ফিরে পেতাম এবং নামাজ পাঠ শেষ হলেই পূনরায় আলমে বেহুঁশীতে প্রবেশ করতাম । এভাবে ৭ দিন সামার মাঝে বিভোর ছিলাম । প্রত্যেক দিন ঐশী প্রেমাকার্ষণের একটা করে নতুন মহত্তা উপভোগ করতাম ।
এরপর এরশাদ করলেন, আমি এবং কাজি হামিদুদ্দীন নাগুরী, এক শহরে পৌছে দেখলাম, ১২ জনের একটি দল আকর্ষিত হয়ে নিজ নিজ সত্তা হতে বিমুক্ত হয়ে অত্যাশ্চর্যের জগতে অবস্থান করছেন। আমরা এদের সাথে সাক্ষাত করলাম , প্রত্যেকে সাহেবে কামাল বা পরিপূর্ণতার স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন । এরপর আমাকে এরশাদ, করলেন, হে ফরিদ , আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণ মাসুম (নিঃপাপ) এবং আউলিয়া কেরামগণ মাহফুজ (সুরক্ষিত বা নিরাপদ ) কারণ, উম্মত্ততার জগতেও তাঁদের দ্বারা কোন শবীয়ত বিরোধী ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন হয় না । এরপর এরশাদ করলেন , আমি আমার মূর্শেদ হযরত খাজা বুজুর্গের সাথে হজ্বব্রত পালনের জন্য গিয়েছিলাম , ফেরার পথে এক শহরে অবস্থান করছিলাম , শহরটির নাম এই মূহুর্তে স্মরণ নেই । সেখানে এক বুজুর্গের সাথে দেখা হলো, তিনি অত্যন্ত মহিমান্বিত ছিলেন । তিনি একটা তিনি গুহায় বাস করতেন । আল্লাহর ভয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ততার কারণে কারণে তাঁর দেহে মাংস অবশিষ্ট ছিল না । তাঁকে দেখলে মনে হয় একখন্ড শুকনো কাষ্ঠ । খাজা বুজুর্গ আমার দিকে খেয়াল করে বললেন, তোমার ইচ্ছা হলে কিছুদিন কয়েকদিন অপেক্ষা করতে পার । আমি বললাম , হুজুর আপনার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা , আপনি যে নির্দেশ দিবেন তাই করবো । অবশেষে আমি এবং খাজা বুজুর্গ উভয়ে এক মাসের ও বেশী সময় তাঁর সঙ্গে কাটালাম । এ সময়ের মধ্যে তিনি একবার মাত্র একদিন চেতনার জগতে ফিরে এসেছিলেন, মাত্র সামান্য সময়ের জন্য । একটু পরেই আবার অচৈতন্যলোকে প্রবেশ করেছিলেন । আমরা তাঁকে স্বাভাবিক অবস্থায় পেয়ে সালাম জানালাম, তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, "হে বন্ধুদ্বয় তোমাদের এখানে কষ্ট হচ্ছে ঠিকই কিন্তু প্রতিদানে সৌভাগ্য হাসেল হবে । কেননা, আহলে সলুকগণ বলেছেন, যে দরবেশদের খেদমত করে সে অবশ্যই মনজিলে মকসুদে পৌছে যায় । পরে বললেন, । বসো । আমরা বসে পরলাম । নিজের কথা বলতে লাগলেন, বললেন আমি মুহম্মদ আসলাম তৌসী (রহঃ) এর বংশধর। আমি অলৌকিক জগতে পর্দাপন করেছি ৩০ বছর হলো। দিন রাতের কোন সংবাদ রাখি না, হকতায়ালা শুধু আজ আমাকে তোমাদের জন্য চেতনার জগতে ফিরিয়ে এনেছে। হে বন্ধুগন, এখন তোমরা বিদায় নিতে পার । তোমরা এখানে যে কষ্ট করেছ তার প্রতিদাানে আল্লাহ তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন । কিন্তু একটা কথা স্মরণ রেখো, দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পরো না এবং মানবসমাজ ও বস্তুবাদ থেকে দূরে থেকো, যা কিছু তোমরা নজর নিয়াজ হিসাবে পাবে তা অপরের প্রাপ্য মনে করে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেবে । নিজের কাছে কিছুই রাখবে না, তা না হলে দরবেশের মাথার মনি হতে পারবে না । আমার সর্বশেষ উপদেশ হচ্ছে প্রভূর ধ্যান-মগ্নতা ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হবেনা । এ অমূল্য উপদেশ দান করার পর তিনি আল্লাহতায়ালার ধ্যানে মগ্ন হয়ে ঐশী-অচৈতন্যলোকে গমন করলেন। আমি এবং খাজা বুজুর্গ সেখান হতে যাত্রা করে বাগদাদ ফিরে এলাম । যখন হযরত খাজা এ অমূল্য বানী শেষ করলেন, তখন প্রভূর ধ্যানে অচৈতন্যলোকে গমন করলেন । মজলিস এখানেই সমাপ্ত হলো । দোয়া প্রার্থীগন নিজ নিজ আবাসে যেয়ে স্বীয় কাজে মশগুল হলো।
আলহামদুলিল্লাহ আলা জালেক ।
______________________________________________________
তৃতীয় মজলিস
__________________________
৬৪৮ হিজরী নববী (দঃ) সনের পবিত্র শাওয়াল মাসের ৭ তারিখে রোববার দিন পবিত্র কদম মোবারক চুম্বনের সৌভাগ্য বান হলাম । আলোচনা "সলুক" সমন্ধে হলো । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম আদামাল্লাহু বাকাউহু এরশাদ করলেন, অনেক শায়খ (পীর) ও তরিকতের আউলিয়া সলুকের ১৮০টি স্তর বা সোপান নির্ধারণ করেছেন। জোনায়দিয়া/কাদরিয়া তরিকার পীরগণ এই স্তরের সংখ্যা নির্ধারণে করেছেন ১০০ টি । জুন্নুন তরিকার ওলীগণ বলেছেন, এই স্তরের সংখ্যা ৭০টি । তবকাতিয়া, ইব্রাহিম এবং বশ্ রেহানী তরিকাগুলোর মাশায়েখ এই স্তরের সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন ৫০টি । খাজা বায়োজি ত বোস্তামী (রহঃ), হযরত আবদুল্লাহ মোবারক (রহঃ) এবং খাজা সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেছেন, সলুকের সর্বমোট সংখ্যা ৪৫টি । শাহ্ সোজা কিরমাণী (রহঃ) , সামনুন মূহেব্বা (রহঃ), এবং খাজা মীরয়াতিশ (রহঃ) এর তরিকায় সলুকের স্তরের সংখ্যা ২০টি , কিন্তু আমাদের মাশায়েখ রেদোয়ান আল্লাহুআনহু আজমাইন বলেছেন, সলুকের সর্বমোট স্তরের সংখ্যা ১৫টি । এরপর তিনি এরশাদ করলেন, এই স্তরেগুলোর মাঝে একটি স্তর আছে কাশফ ও কারামতের । প্রত্যেকের উচিত ঐ স্তরে নিজেকে গোপন রাখা । যে ব্যাক্তি কাশ্ ফ ও কারামতের স্তরে নিজেকে প্রকাশ করবে সে সম্মূখের স্তর হতে বঞ্চিত হবে । কাশ্ ফ ও কারামতের স্তর বিভিন্ন ভাবে দেখানো হয়েছে । যে সব তরিকায় মোট স্তরের সংখ্যা ১৮০টি তাঁদের নিকট কাশ্ ফ ও কারামতে স্তরিটি হচ্ছে ৮০ । জোনায়দিয়া তরিকায় এ স্তরিটি ৭০ । বশরিয়ায় ৩০ এর স্তরটি হচ্ছে কাশ্ ফ কারামতের । জুনুন মিস্ রী তরিকায় এ স্তরটি হচ্ছে ২৫-এর । শাহ্ সোজা কিরমাণীর নিকট এ স্তর টি হলো ১০- । সর্বশেষে খাজা গানে চিশতী- এর নিকট ৫ম স্তর হচ্ছে কাশ্ ফ ও কারামতের । সুতারাং সেই হবে সফলকাম হবে যে কাশ্ ফ ও কারামতের স্তরে নিজেকে প্শ না করে সমস্ত স্তরগুলো অর্জন করে নেবে । এই স্তরে কাশফ ও কারামত প্রকাশ করলে অবশিষ্ট স্তর হতে বঞ্চিত হতে হবে । এরপর আমাকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, আহলে সলুকগন এসব স্তর এ জন্য রেখেছেন যাতে সলুকের পথের পথিকদের পথ চলতে সহজ হয় । তাছাড়া সে তার অবস্থা দ্বারা কোন স্তরে অবস্থান করছেন তাও যেন বুঝতে পারে এবং সে অনুসারে চেষ্টা করতে পারে ।এ পর্যন্ত বলার পর হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এর চোখ অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো । তারপর বলতে লাগলেন, উম্মতে মুহাম্মদীর (দঃ) মধ্যে এমন অসাধারণ ও অতুলনীয় ব্যাক্তিত্বের আর্বিভাব ঘটেছিলো যাদের মধ্যে অনেকে গত হয়েগেছেন এবং অনেকে এখনও বর্তমান আছেন, যারা সলুকের ঐ নির্ধারিত স্তর অতিক্রম করার পরও আরও হাজারো উর্ধের স্তর অতিক্রম করেছেন, কিন্তু কোনদিন বন্ধুর রহস্য বাইরে প্রকাশ করেননি এবংএবং তারা এটাও কোনদিন খেয়াল করেননি যে, আমি কে এবং কি । হে ফরিদ, কোন ব্যাক্তি এ নির্ধারিত স্তরসমূখে অতিক্রম করার পর আরও সমূখের লাভ করে খোদার ধ্যান মগ্ন অলৌকিক । অচৈতন্যলোকে চলে যান এবং তাঁর বিরহ -বিচ্ছেদ মিলনে পরিবর্তন হয় । হযরত খাজা কুতুবউদ্দিন (রহঃ) এ পর্যন্ত বলা শেষ করে ঐশী অচৈতন্যলোকে গমন করলেন । দোয়াপ্রার্থী গণ স্ব স্ব স্থানে যেয়ে মশগুল হলেন ।
আলহামদুলিল্লাহ আলা জালক ।
-------------------------------------
চতুর্থ মজলিস
সোমবার ১৫ ই জিলক্বদ, ৬৪৮ হিজরী। প্রথমে কদমবুসীর সৌভাগ্য অর্জন করলাম । মজলিসে মাওলা আলাউদ্দীন কিরমাণী,
শায়খ মাহমুদ ও অনেক সুফী দরবেশগণ খেদমতে হাজির ছিলেন । তকবীর বলা সমন্ধে আলোচনা শুরু হলো। প্রশ্ন উঠলো দরবেশগণ যে, অলি গলিতে তকবীর (আল্লাহু আকবর ) বলে তার অর্থ কি ? হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এরশাদ করলেন যে, এমন কথা কোথাও লেখা নেই যে, প্রত্যেক গলিতে তাকবীর বলা হবে এবং এ অভ্যাস ভালোও নয় । কিন্তু তকবীর সমন্ধে হাদিস শরীফে বর্ণীত আছে নেয়ামতের (আল্লাহর দান) শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তকবীর বললে বৃদ্ধি পায় । এরপর এরশাদ করলেন, তকবীরের অর্থ হার্মদ (প্রশংসা) এবং নেয়ামত বা দানের জন্য শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিচ। তকবীর বা প্রশংসাই হচ্ছে কৃতজ্ঞতা । এরপর বললেন, একবার আমি যখন শায়খ শায়খ শাহাবুদ্দীন ওমর সোহরাওয়ার্দী (রহঃ) এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম , তিনি বাগদাদে থাকতো । সঙ্গলাভের সুযোগ আমার প্রায়ই ঘটতো, তিনি প্রকৃতই জাহেদ, আবেদ ও বুজুর্গ হিসেবে এক অনন্যসাধারণ ব্যাক্তিত্ব ছিলেন। আমি তাঁর মত বুজুর্গ খুবই কম দেখেছি । একদিন এক দরবেশ তাঁর খেদমতে এসে সালাম করে হস্ত মোবারক ধরতেই তসবীহ ও তকবীর বলে উঠলেন, হযরত তার কর্ম দেখে অত্যন্ত কঠোর হলেন এবং বলতে লাগলেন, একবার রসূলে খোদা (সাঃ) এর পাশে সাহাবী গণ বসা ছিলেন । হুজুর করিম (সাঃ) এরশাদ করলেন, কেয়ামতের দিন আমার উম্মত দ্বারা বেহেস্তের এক চতুর্থাংশ পূর্ণ হবে অবশিষ্ট তিন চতুর্থাংশ অন্যান্য নবীর উম্মত দ্বারা পূর্ণ হবে ।
এ কথা করার সাথে সাথে হযরত আমিরুল মু'মেনীন আবুবক্কর সিদ্দিক দাঁড়িয়ে বললেন, । এসো এ নিয়ামতের শুকরিয়া তকবীর (আল্লাহু আকবর ) বলি । হযরত আবুবকর (রাদিঃ) এর জবান মোবারক হতে একথা বেরুতেই সাহাবীগণ দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং তকবীর বললেন । এরপর হযরত রসুলে খোদা (সাঃ) এর নিকট ওহী এলো, আপনার উম্মত দ্বারা বেহেস্তের এক তৃতীয়াংশ পূর্ণ হবে এবং দুই তৃতীয়াংশ অন্যান্য নবীর উম্মত দ্বারা পূর্ণ হবে । যখন হুজুরপাক (সাঃ) এ সুসংবাদ সাহাবীদের শোনালেন, তখন হযরত আমিরুল মু'মেনীন ওমর বিন খাত্তাব (রাদিঃ) দাঁড়িয়ে হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রাদিঃ) এর অনুরূপ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সাহাবী (রাদিঃ)গণ হযরত ওমর ফারুক (রাদিঃ) এর ইচ্ছার প্রতি সাড়া দিয়ে তকবীর বললেন। এরপর হযরত রসূলে মকবুল (সাঃ) আরও খুশীর খবর শুনিয়ে বললেন, হাশরের দিন আমার উম্মত দ্বারাই বেহেস্তের অর্ধেক পূর্ণ হবে । এবং বাকি অর্ধেক পূর্ণ হবে অন্যান্য নবীর উম্মত দ্বারা । এ সুখবরে হযরত আমিরুল মু'মেনীন ওসমান এবনে হাফ্ফান (রাদিঃ) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং নিজে পূর্বোক্ত দু 'বন্ধুর মতো ইচ্ছা প্রকাশ করায় সাহাবী (রাদিঃ) গণ দাঁড়িয়ে তকবীর করলেন। এরপর হযরত রসূলে পাক (সাঃ) এরশাদ করলেন, যে পর্যন্ত আমার উম্মত বেহেস্তে প্রবেশ না করবে সে পর্যন্ত অন্যান্য নবীর উম্মত বেহেস্তে প্রবেশ করতে পারবে না । হযরত আমিরুল মুমেনীন আলী এবনে আবু তালিব (রাদিঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, সুসংবাদের শুকুর আদায় করার জন্য তকবী বলা প্রয়োজন । (রাদিঃ) গণ দাঁড়িয়ে তকবীর বললেন। এরপর হযরত শায়খ শাহাবুদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দী (রহঃ) বললেন, দরবেশগণ যে চার তকবীরের কথা বর্ণনা করেছেন সেগুলি এই তকবীর । ।
- সুতারাং সবসময় তকবীর বলা উচিত নয় । এরপর আলোচনা শুরু হলো, পীরের উপস্থিতিতে নফল নামাজ পাঠ করা সমন্ধে । প্রশ্ন হলো, মুরীদ নফল নামাজে রত থাকা অবস্থায় যদি পীর তাঁকে ডাকে এবং যদি সে নামাজ ত্যাগ করে চলে আসে তাহলে তাঁর ফল কি হবে ? হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এরশাদ করলেন, নফল নামাজ ছেড়ে দিয়ে পীরের ডাকে সারা দেয়া কল্যাণকর, এর সওয়াব অনেক কিন্তু নফল নামাজের সওয়াব ততবেশী নয় । একবার আমি নফল নামাজ রত অবস্থায় আমার মুর্শেদ হযরত খাজা বুজুর্গ আমাকে ডাক দিলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে নামাজ ছেড়ে দিয়ে উত্তর দিলাম। তিনি বললেন, এসো। আমি পবিত্র খেদমতে হাজির হলাম । তিনি এরশাদ করলেন, কি করছিলে ? আমি বললাম , নফল নামাজে ব্যাস্ত ছিলাম, আপনি ডাকলেন তাই খেদমতে হাজির হলাম । তিনি শুনে বললেন, খুব ভালো করেছো । নিজের পীরের আদেশ পালন নফল নামাজ হতে উৎকৃষ্ট । এরপর এরশাদ করলেন, আমি হযরত খাজা নাসিরুদ্দিন আবু ইউসুফ চিশতী (রহঃ) এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম অনেক সুফী বুজুর্গানে চিশতী পবিত্র খেদমতে হাজির ছিলেন । আল্লাহর আউলিয়াদের কারামত সমন্ধে বর্ণনা চলছিলো । একজন আল্লাহর পথের শিক্ষার্থী পবিত্র খেদমতে হাজির বয়াত হওয়ার জন্য আরজ করলেন। তিনি এরশাদ করলেন, বসো, সে বসে পড়লো এবং দ্বিতীয়বার আবেদন করলো যে, আম বাসনা নিয়ে এসেছি , হযরতের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হবো । তিনি তখন অত্যান্ত খুশী ছিলেন, বললেন, যদি তুমি আমার নির্দেশ পালন র তাহলে তোমাকে আমার মুরীদ করতে কোন আপত্তি নেই । সে আরজ করলো , নির্দেশ পালনে বান্দা প্রস্তুত আছে । হযরত আবু ইউসুফ চিশতী (রহঃ) এরশাদ করলেন, তুমি কালেমার লা-ই-লাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পাঠ করো । ঐ ব্যাক্তি বলার সাথে সাথেই বিনা দ্বিধায় তাঁর নির্দেশ পালন করলো । তিনি তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে বয়াত করে নিলেন এবং অত্যন্ত দয়াপরশ হয়ে নিজের বিশেষ পরিচ্ছদ দান করলেন। এরপর বললেন, আমি নিজেই হযরত রসূলে মকবুল (সাঃ) এর গোলাম । এতএব, আমার কি ক্ষমতা আছে তাঁর সমপর্যায়ের মর্যাদার দাবী করা, এটা শুধু তোমার বিশ্বাসের দৃঢ়তা পরিক্ষার জন্য করা হয়েছে । তুমি সে পরীক্ষায় উত্তির্ণ হওয়ায় তোমাকে মুরীদ করা হলো । এবার এসো, আমরা তওবা করে নেই । এরপর এরশাদ করলেন, যখন কোন ব্যাক্তি তওবা করে তাঁর উচিত যে সে যাদের সাথে উঠাবসা করায় নিষিদ্ধ কর্মে প্ররোচিত হয়েছিলো, তাদেরকে ত্যাগ করা এবং কোন সময়ের জন্যই তাঁদের সাথে উঠাবসা না করা কেননা, এতে ভয়ের কারণ রয়েছে যদি সে প্রথম বারের মতো আবার কোন অন্যায় করে বসে । এরপর এরশাদ করলেন, খাজা হামিদুদ্দীন সোহানী অনেক বড় বুজুর্গ ছিলেন । যখন তিনি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী সঞ্জরী (রহঃ) এর হাতে হাত রেখে তওবা করলেন এবং খানকা শরীফে অবস্থান করলেন, তখন তার পুরাণে আরিফ বন্ধুগণ এসে ইচ্ছা পোষণ করলো যে সে যেন তাদের সঙ্গ ত্যাগ না করে পুরাণে প্রক্রিয়ার (জওক শওক) ওপর দৃঢ় থাকে । খাজা হামিদুদ্দীন তাদেরকে কটাক্ষ করে বললেন, আমার নিকট হতে চলে যাও, বেশী বকবক করো না । আমি পাজামার ফিতা এতো মজবুত করে বেধেছি যে হাশরেরদিন বেহেস্তের হুরদেরকে দেখেও খুলবো না । খাজা কুতুবউদ্দিন কাকী (রহঃ) বর্ণনা করে যাচ্ছিলেন, এমন সময় খাবার সামনে হাজির হলো, তিনি আহারে মনোনিবেশ করলেন । খাওয়া শেষ না হতেই হযরত শায়খ নিজামুদ্দিন আবুল মুঈদ (রহঃ) উপস্থিত হয়ে সালাম দিলেন কিন্তু খাজা কুতুব (রহঃ) সালামের উত্তর দিলেন না, এমনকি তার সাথে কোন কথাও বললেন না । এ জন্য হযরত শায়খ নিজামুদ্দিন আবুল মুঈদ (রহঃ) অত্যন্ত অপমানবোধ করলেন। যখন খাজা কুতুব (রহঃ) আহার শেষ করে মজলিসে উপস্থিত হলেন, তখন খাজা নিজামউদ্দীন আবুল মুঈদ জিজ্ঞেস করলেন যে, আপনি যখন আহার করছিলেন তখন আমি উপস্থিত হয়ে সালাম আরজ করেছিলাম , কিন্তু আপনি ছালামের উত্তর না দেওয়ার কারণ কি ? হযরত খাজা কুতুব (রহঃ) এরশাদ । করলেন, আমি আহারে ব্যাস্ত ছিলাম তখন সালামের জবাব দেওয়া সম্ভব ছিলো না । কারণ দরবেশ এবাদতের শক্তি অর্জনের জন্য আহার করে থাকেন । যখন তার এ নিয়ত হয় তখন সে আইন অনুযায়ী এবাদতে নিমগ্ন থাকে তাই সে । জবাব দিতে পারে না । সুতারাং উচিত হলো , যদি কেউ আহারে রত থাকে, তবে তাকে সালাম না দেয়া । আহার শেষ । হলে ছালাম দেয়া উচিত । ইমামুল হারামাইন এরশাদ করলেন যে , একথা যা তিনি বর্ণনা করলেন, তা কি স্বীয় জ্ঞান দ্বারা না কোন উদ্ধৃতি ? হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম এরশাদ করলেন, এ কথা আমার জ্ঞানের মধ্য হতে বর্ণনা করেছি । এখানেই তার বক্তব্য শেষ করে তিনি আল্লাহতে মশগুল হলেন । মজলিস শেষ হলো । দোয়াপ্রার্থীগণ যার যার নির্দিষ্ট স্থানে যেয়ে মশগুল হলেন ।
- আলহামদুলিল্লাহ আলা জালেক ।
- _____________________________________________________
- পঞ্চম মজলিস
- বৃহস্পতিবার ৫ই জিলহজ্ব ৬৪৮ হিজরী । প্রথমে কদমবুসী অর্জিত হলো। বহু দরবেশ ও আহলে সূফ্ ফা ছাড়া ও ছিলেন, কাজী হামিদুদ্দীন নাগুরী, মাওলানা আলাউদ্দীন কিরমাণী, সৈয়দ নুরুদ্দীন মোবারক, সৈয়দ শরফুদ্দীন, মাওলানা আলীম উদ্দীন, মাওলানা শরফুদ্দীন, শায়খ আবুল হাই, শায়খ মাহম্মুদ মোজাদ্দজ ও মাওলানা যাকিয়া । এদেঁর প্রত্যেকে এক একজন অনন্যসাধারণ, কারো সাথে কারো তুলনা হয় না । জমিন হতে আরশ পর্যন্ত তাদেরকে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বলে মনে হচ্ছিলো, প্রত্যেকেই পবিত্র খেদমতে উপস্থিত ছিলেন। হজ্ব এবং কাবা শরীফ পরিভ্রমণ সমন্ধে আলোচনা শুরু হলো । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) এরশাদ করলেন যে, খোদাতায়লার এমন বান্দাও আছেন যাদের সম্মানে খানা কাবার প্রতি নির্দেশ হয় আপন জায়গা হতে সেই বুজুর্গের নিকট যেয়ে উপস্থিত হওয়ার যাতে তিনি সেখান হতেই তওয়াফ করতে পারেন । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম (রহঃ) বলছিলেন যে, হযরত খাজা বুজুর্গ এবং আমরা সব আহলে সুফ্ ফা দাঁড়িয়ে ঐশী অত্যাশ্চার্যের জগতে বিলীন ছিলাম । আমার নিজের অস্তিত্বের কোন চেতনা ছিল না । আমি প্রেম পরিতৃপ্তি র জগতের মজলিসে বিলীন ছিলাম । ইত্যবসরে হযরত খাজা ও আমি উচ্চস্বরে তকবীর বললাম , যে রকম কাবা তওয়াফের সময়ে বলতে হয় । প্রেম- পরিতৃপ্তির উন্মাত্ততায় প্রত্যেকের শরীর হতে রক্ত ঝরতে লাগলো । রক্তের ফোঁটা যেখানেই পড়ছিলো সেখানেই তকবীর সমূহ প্রকাশ পাচ্ছিলো । এরপর আমাদের জ্ঞান ফিরে এলে আমরা কাবা শরীফ তওয়াফ করার অনুরূপে রক্তে লিখিত তকবীরের চারিদিকে চারবার পরিভ্রমণ করলাম । সাথে সাথে আওয়াজ হলো, 'খাজা বুজুর্গ ও অন্যান্য আহলে সুফ্ ফাদের হজ্ব কবুল করা হলো । এরপর এরশাদ করলেন, হযরত খাজা গরীব নওয়াজের নিয়ম ছিলো, প্রত্যেক বছর আজমীর শরীফ হতে কাবাঘর জেয়ারতের (দর্শনের) জন্য যেতেন । যখন তাঁর কর্ম পূর্ণ পরিপূর্ণতা লাভ করলো , অর্থাৎ তিনি কামিলিয়াতের (পরিপূর্তার) সর্বশেষ ধাপটি অতিক্রম করলেন, তখন কাবা ঘরের জেয়ারতকারীগণ হযরত খাজা গরীব নওয়াজকে জেয়ারতের সময় মক্কা শরীফে উপস্থিত পেতেন । কিন্তু তিনি আজমিরে নিজের আবাসে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন । অবশেষে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে, তিনি প্রত্যেক রাতে কাবাঘর জিয়ারতে যেতেন এবং সকাল হওয়ার পূর্বেই ফিরে এসে ফজরের নামাজ জামাতের সাথে সমাধা ন করতেন। আরও বললেন যে, তিনি বলতেন আমি খাজা ওসমান হারুণী (রহঃ) এর মুখে শুনেছি , তিনি বলেছেন, হযরত খাজা মওদুদ চিশতী যখন কাবাঘর জেয়ারতের বাসনা তখন ফেরেস্তাগন কাবাঘর তার সন্নিকটে নিয়ে যেতেন । এবং তিনি জিয়ারতকারীর মর্যাদা অর্জন করতেন। এ অবস্থায় যদি নামাজের সময় ঘটতো তাহলে তিনি কাবা ঘরের সামনে নামাজ
- পরতেন । এবং জেয়ারত শেষ হলে ফেরেস্তা গণ পূনরায় তার নির্ধারিত স্থানে নিয়ে স্থাপন করতেন। এরপর এরশাদ করলেন, হযরত খাজা হোজায়ফা মারআসি (কুঃ সাঃ) উচ্চপর্যায়ের বুজুর্গ ছিলেন । ৭০ বছর তিনি সেজদাহ্ হতে হাত পা তুলেননি । হজ্বের দিন উপস্থিত ব্যাক্তিগণ তাকে কাবা ঘরে দেখতে পেতেন । এবং প্রত্যাবর্তনের সময় বলতেন, আমরা হযরতের কাবাঘর ও বায়তুল মোকাদ্দাস ( যে গুলো তিনি জেয়ারত) জেয়ারতকারীদের অন্তভুর্ক্ত । এরপর কোরান মজীদ ও ফোরকানে হামিদ সমন্ধে অমিয়বানী পেশ করলেন । বললেন , প্রথমদিকে আমি সম্পূর্ণ কোরানশরীফ হেফ্ জ করতে পারতাম না, যার জন্য চিন্তিত হয়ে পরলাম । একরাতে স্বপ্নে হযরত রসুলে মকবুল (সাঃ) কে দর্শনের সৌভাগ্য হলো । আমি তাঁর কদম মোবারকে চুমু খেলাম । তিনি আমাকে মাথা উত্তোলন করার নির্দেশ দিলেন । আমি নির্দেশানুযায়ী মাথা উত্তোলন করলাম । তিনি এরশাদ করলেন, সুরা ইউসুফ মুখস্ত করো । আমি স্বপ্ন হতে জাগ্রত হলাম এবং কয়েকদিনের প্রচেষ্টায় সুরা ইউসুফ মূখস্ত করে ফেললাম । এরপর আল্লাহতায়লা সম্পূর্ণ কোরান শরীফ হেফ্ জ করার সৌভাগ্য দান করলেন । এরপর এরশাদ করলেন, যে ব্যাক্তি কোরান শরীফ মূখস্ত করতে চায় তার উচিৎ সুরা ইউসুফ খুব ভালো ভাবে মূখস্ত করা । ইনশাআল্লাহ তায়লা খুব তারাতারি কোরানশরীফ মূখস্ত হয়ে যাবে । এরপর । এরশাদ করলেন , আমি আমার পীর ও মূর্শেদ হযরত খাজা বুজুর্গের মূখে শুনেছি, তিনি বলতেন, আমি আমার মূর্শেদ খাজা ওসমান হারুণী (রহঃ) এর মুখে শুনেছি যে হযরত খাজা আবু ইউসুফ চিশতী (রহঃ) কোরান শরীফ মূখস্ত করতে পারতেন না । এর জন্য সে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। স্বপ্নে তাঁর পীর ও মূর্শেদ দেখা দিয়ে বললেন, এতো চিন্তিত কেন ? যদি কোরান শরীফ মূখস্ত না হয় তাহলে প্রত্যেকদিন সুরা এখলাস ১০০ বার কোরানশরীফ মনে থাকার জন্য পাঠ করবে । নিশ্চই আল্লাহতায়লা কোরান শরীফ মুখস্ত করিয়ে দিবেন । জাগ্রত হয়ে তিনি পীরের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করলেন এবং অল্পদিনের মধ্যে কোরণ শরীফ মূখস্ত করে ফেললেন । এরপর তিনি প্রতিদিন ৫ বার কোরান শরীফ খতম করতেন, তারপর অন্যান্য এবাদতে মশগুল হতেন । এ পর্যন্ত বলার পর হযরত খাজা কুতুব (রহঃ) ধ্যানমগ্ন হয়ে ঐশী অচৈতন্য লোকে গমন করলেন । মজলিস শেষ হলো । । দোয়াপ্রার্থীগণ বিদায় নিয়ে চলে গেলেন ॥
- আলহামদুলিল্লাহ আলা জালেক ॥
- ষষ্ঠ মজলিস
- শনিবার, ২০ শে জিলহজ্ব ৬৪৮ হিঃ । মজলিসের শুরুতে কদমবুসী লাভ করলাম । মাননীয় সূফী -দরবেশগণ ও আল্লাহর করুনাপ্রাপ্ত ব্যাক্তিবর্গ মহতী মজলিসে উপস্থিত ছিলেন । শাম্ স্ -এর জলাধার প্রস্তুতের সমন্ধে আলোচনা শুরু হলো । হযরত খাজা কুতুবুল ইসলাম এরশাদ করলেন, যখন সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাস কিংবদন্তী- জলাধার স্থাপন করতে চাইলো তখন তার জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচনে প্রত্যেকদিন মন্ত্রীবর্গকে সাথে নিয়ে বেরুতেন॥ ।
- যখন তারা বর্তমান জলাধারের নিকট পৌছলো তখন সেখানকার জমি দেখে সুলতানের অত্যধিক পছন্দ হলো। সে তার মন্ত্রীদের কে বললো প্রস্তাবিত জলাধারের জন্য স্থানটি অত্যন্ত উপযোগী ।
- মন্ত্রীগণও স্থানটি পছন্দ করলো। । সুলতান আল্লাহর সাক্ষাতকারীও ছিলো।
প্রাসাদে পৌছে নির্ধারিতসময়ে শুয়ে পরলো । রাতে স্বপ্নে দেখলো জলাধারের নির্বাচিত স্থানের সন্নিকটে মধ্যাকৃতির লম্বা কেশ বিশিষ্ট এক অনিন্দ্য পুরুষ, যার রূপসৌন্দর্য বর্ণনাতীত- কয়েকজন পরিচারক ও বন্ধু সঙ্গী সাথী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একবার সুলতান তাদের দিকে দৃষ্টি পাত আবার তারা সুলতানকে দেখছেন , এ সময় তাদের মধ্য হতে একজন লোক সুলতানের নিকট এসো তোমাকে রসূলে । খোদা (সাঃ) এর যেয়ারত করিয়ে দিচ্ছি । সে তার সাথে গেলো । আগন্তুক ঘোড়ার ওপর উপবিষ্ট মহামানবকে দেখিয়ে বললেন, হে শাম্ স্ উনিই হচ্ছে ন হুজুরপাক (সাঃ), তোমার যা কিছু আরজ করার আরজ কর । সুলতান তাঁর কদম মোবারকে পড়েগেলো এবং যে হা'ওজ (জলধার) তৈরীর বাসনা তার অন্তরে ছিলো আবেদন করলো । তিনি ঘোড়াকে স্বীয় গোড়ালী দ্বারা আঘাত করলেন । ঘোড়া লাফিয়ে উঠলো এবং পায়ের আঘাত মাটিতেই পড়তেই সেখান থেকেই পানি বেড়িয়ে আসলো । তিনি এরশাদ করলেন, হে শাম্ স্ এই জায়গায় হা'ওজ তৈরী কর, কেননা এখানকার মতো সুস্বাদু ও মিষ্ট পানীয় পানি দূনিয়ার কোথাও নেই । সুলতান নিদ্রা হতে জাগ্রত হয়ে উজিরদেরকে সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে যেয়ে দেখলেনঘোড়ার পায়ের দাগ ও পানীয় নহর বর্তমান রয়েছে । শামসুদ্দীন ঘোড়া হতে অবতরণ করে পানি পান করলো এবং মন্ত্রীগণও পান করলো । এবং পানির প্রসংসায় সবাই বললো, এমন সুস্বাদু পানীয় দুনিয়ার কোথাও পাওয়া যাবেনা । এরপর খাজা কুতুবুল ইসলাম এরশাদ করলেন, তোমরা পানিতে যে সুস্বাদ ও মিষ্টতা অনুভব করো সে সবই রসূলে মকবুল (সাঃ) এর কদম মোবারকের সদকা এবং দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, যে এসব হা'ওজের নিকটে ও আশে পাশে সর্বদা খোদার প্রেমিকগণ পরিতৃপ্ত হন এবং জানি না কেয়ামত পর্যন্ত তাঁরা কিরূপ পরিতৃপ্ত হবেন । এরপর খাজা কুতুবুল ইসলামের চোখ অশ্রুতে ভারাকান্ত হয়ে উঠলো ।পূনরায় তিনি সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাসের অবস্থা সমন্ধে বলতে লাগলেন যে, সে অত্যন্ত দৃঢ় ও সুশীল মুরীদ ছিলো । প্রায় রাতই তিনি জেগ কাটাতো এবং নাম মাত্র ঘুমাতো, যখন ঘুম থেকে জাগতো প্রথমেই পানির কলস ভরে নিতো । চাকর-নফরদের ডাকতো না, বলতো যে, ওরা আরামে শুয়ে আছে ওদেরকে কেন কষ্ট দিব ? এরপর এরশাদ করলেন, শাম্ স্ প্রায় বাতাই ছদ্মবেশে ঘুরে বেরাতো যাতে প্রজাদের অবস্থা জানতে ও অবলোকন করতে পারে । গরীব । মুসলমানদের বাড়ীতে যেতো এবং টাকা পয়সা দান করতো ॥ প্রত্যেকের অবস্থা জ্ঞাত হওয়ার পর মসজিদ ও বাসের অনুপযোগী স্থানে যেয়ে সেখাকার লোকজনের খোজ খবর নিতো এবং অভিযোগ শ্রবণ করতো । তারপর তাদেরকে বলতো আমার কথা কেউ জিজ্ঞেস । করলে কিছু বলবে না । সকালে দরবারে বসতো এবং রাতে যাদের অভিযোগ শ্রবণ করতো তাদেরকে ডেকে পাঠাতো । তাদের সাথে অত্যন্ত অমীয় ব্যাবহার করতো এবং প্রয়োজন অনুপাতে প্রত্যেককে সাহায্য করতো । তারপর প্রত্যেকের উদ্দেশ্যে করে বলতো তোমাদের ওপর কেউ যদি তোমাদের উপর জুলুম অত্যাচার করে তা হলে সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে সংবাদ দিবে । এখন আমি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, যে কোন বিষয়ে নিস্পতি বা মিমাংসা যা করতে হয় এখন কেননা, হাশরেরদিন তোমাদের কোন ব্যাপারে মীমাংসা করার । শক্তি আমাদের থাকবে না । এরপর হযরত খাজা কুতুব (রহঃ) এরশাদ করলেন, এ ধরনের কথা সে এ জন্য বলতো যেন অত্যাচারিদের দাবী তার ওপর থেকে চলে যায় এবং এ কথা যেন বলার অবকাশ থাকে যে, আমি তোমাদের কে ডেকেছিলামম কিন্তু তোমরা আসো নাই । এরপর এরশাদ করলেন, এক রাতে সে হঠাৎ এসে আমার পায়ে পরেগেলো । আমি তাঁকে উঠিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অতো ভীত সন্ত্রস্ত কেন ? সে আরজ করলো, হুজুরের দয়ায় এ রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন-পালনের বাদশাহী আমি পেয়েছিলাম , আজ আমার বাসনা হাশরের দিনে লজ্জিত হওয়া থেকে মুক্তি পাওয়া । যেভাবে এখানে আপনি আমার দামন ধরে রেখেছেন, কথা দিন সেখানেও এমনি ভাবে ধরে রাখবেন । আমি তার কথায় রাজি হওয়ার পর সে আমাকে ছাড়লো এবং সুন্তুষ্টচিত্ত বিদায় নিলো ।এএ - রপর এরশাদ করলেন, একবার আমি সফরে বাদাউন ছিলাম, তখন এ শামসুদ্দীনও সেখানে এক ময়দানে পালা খেলার । জন্য উপস্থিত ছিলো, এক বৃদ্ধ বয়সের লোক এসে কিছু প্রার্থনা করায় সে কোন উত্তর । দিলো । একটু পরেই এক যুবক এসে কিছু প্রার্থনা করায় তাকে একমুঠো টাকা দিলো । উপস্থিত লোকজন সুলতানের ব্যাবহারে অবাক হয়ে গেলো । সে তাদের মনের কৌতূহল দূর করার জন্য বললো , হে বন্ধু গণ প্রত্যেককে দেওয়ার মালিক হলেন, আল্লাহতায়লা, আমি কেউ নই । তিনি যাকে দেওয়ান তাকেই দেই । এরপর শায়খ নিজামুদ্দিন ছোগরা, শায়খুল ইসলাম দেহেলবী এবং শায়খ জালালুদ্দীন তিবরিজী (রহঃ) এর একটি ঝগড়া বর্ণনা করলেন । শায়খুল ইসলাম দেহেলবী, শায়খ জালালুদ্দিন তীবরিজী (রহঃ) এর প্রতি অপবাদ রটালো যে, সে কিশোর দের সাথে সোহবত (সঙ্গ) করে । যখন এ ঝগড়া সুলতান শামসুদ্দীনের নিকট পেশ করা হলো তখন সে অনুসন্ধানের নির্দেশ দিলেন । অভিযোগ পত্র তৈরী করায়ে তাতে মোহর লাগানো হলো । বাদশাহ হুকুম দিলো, শায়খ জালালুদ্দিন তীবরীজিকে উপস্থিত করো । আমিও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম । শায়খ জালালুদ্দীন সুলতানের দরবারে উপস্থিত হলেন , সুলতান তার অবস্থা জিজ্ঞেস তিনি আদ্যোপান্ত বর্ণনা এবং বললেন, এ । মামলায় একজন মুন্সেফ নিযুক্ত নিযুক্ত করা উচিত । শায়খুল ইসলামকে এ প্রস্তাবের ওপর তার মতামত জিজ্ঞেস করায় সেও সম্মতি দিলো যে, শায়খ জালালুদ্দিন যাকে মুন্সেফ নিযুক্ত করা উচিত। শায়খুল ইসলামকে এ প্রস্তাবের ওপর তার মতামত জিজ্ঞেস করায় সেও সম্মতি দিলো যে , শায়খ জালালুদ্দীন যাকে মুন্সেফ নির্ধারণ করবে তার প্রতি আমার সমর্থন থাকবে । শায়খ জালালুদ্দিন বললেন, আমি শায়খ বাহাউদ্দিন জাকারিয়াকে মুন্সেফ নির্ধারণ করলাম ।
- কিন্তু বাহাউদ্দিন জাকারিয়া দিল্লী উপস্থিত ছিলেন না । তিনি তখন মুলতানে অবস্থান করছিলেন । শায়খুল ইসলাম প্রতিবাদ করে বললেন, সে কখন এখানে আসেন তার কোন ঠিক নেই, তাই অন্য কোন মুন্সেফ ঠিক করা উচিত । শায়খ জালালুদ্দিন তীবরীজি (রহঃ) বললেন, কাল তিনি এখানে উপস্থিত থাকার । জন্য তসরিফি আনবেন । সবাই শুনে অবাক হয়ে গেলো । সুতরাং পরেরদিন দিল্লির সমস্ত লোক হৈ চৈ করতে করতে দরবারে উপস্থিত হলো । বিচার শুরু হলো , শায়খ জালালুদ্দিন তিবরীজি ও হাজির ছিলেন। সে তাঁর পরিস্কার জুতোর উপর উপবিষ্ট হলেন । সবাই অনুরোধ করলো আপনি ওপরে নিজের জায়গায় বসুন । তিনি উত্তর দিলেন এ সময় আমার স্থান এখানেই । এরপর মোকাদ্দমা শুরু হলো, প্রত্যেকেই যার যার বক্তব্য প্রকাশ করতে লাগলো। কিন্তু একটু পরেই শোনা গেল , খাজা বাহাউদ্দীন জাকারীয়া মুলতানী আসছেন । সবাই তাজ্জব হয়ে গেলো যে, তাকে কে খবর দিলো, এবং কবে সে মুলতান থেকে রওয়ানা হয়ে আজ এখানে আসছেন ? সকলের ভাবনা চিন্তা ছিন্ন করে হযরত খাজা বাহাউদ্দীন জাকারীয়া (রহঃ) দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন । সমস্ত লোক এ বুজুর্গের সম্মানে দাঁড়িয়ে পড়লেন । তিনি দরবারে প্রবেশ করেই প্রথমে হযরত শায়খ জালালুদ্দীন তীবরিজী (রহঃ) জুতা মোবারক হাতে নিলেন এবং চুমু খেলেন ও চোখে লাগালেন । প্রত্যেকের কাছে জালালুদ্দীনের বুজুর্গী প্রকাশ হয়ে গেলো । সবাই তাদের ব্যাবহারের জন্য লজ্জিত হলো । প্রত্যেকের চোখের পর্দা উম্মোচন হয়ে গেলো এবং যার যার অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলো । সুলতান শামছুদ্দীন ও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ক্ষমা চাইলেন । হযরত শায়খ জালালুদ্দীন প্রত্যেককে ক্ষমা করে দিলেন । খাজা বাহাউদ্দীন দরবার কক্ষ ত্যাগ করে সকলের সাথে বেড়িয়ে গেলেন এবং রাতে যমুনা নদীর তীরে অবস্থান করলেন । সকালে যে যার অবস্থানে চলে গেলেন । খাজা কুতুব (রহঃ) তাঁর বক্তব্য এখানেই শেষ করলেন ॥
- আলহামদুলিল্লাহ আলা জালেক ॥
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন